ডিসকভারি এগ্রোটেক
মাটি, সার ও সেচ

ট্রাইকোডার্মা ব্যবহারের নিয়ম ও গোড়া পচা রোগ ঠেকানো

ট্রাইকোডার্মা মাটির উপকারী ছত্রাক, মানুষের ক্রিম নয়। ট্রাইকো-কম্পোস্ট হেক্টরপ্রতি 2.5 টন হারে চারা লাগানোর 2-3 সপ্তাহ আগে মাটিতে দিতে হয়, আর ট্রাইকো-লিচেট প্রতি লিটার পানিতে 20 মিলি হারে 10-15 দিন পর পর। এটি রোগ হওয়ার আগে কাজ করে, হওয়ার পরে নয়।

দুই হাতে ঝুরঝুরে কালচে ট্রাইকো-কম্পোস্ট ভেঙে তৈরি সবজির বেডের মাটিতে ছড়ানো হচ্ছে; পেছনে সারিবদ্ধ কচি চারা।
চারা লাগানোর দুই থেকে তিন সপ্তাহ আগে মাটিতে ট্রাইকো-কম্পোস্ট মিশিয়ে দিলে গোড়া পচার ঝুঁকি কমে।

প্রথমেই একটা বিভ্রান্তি সরিয়ে নেওয়া দরকার। ইন্টারনেটে “ট্রাইকোডার্মা” খুঁজলে মানুষের চর্মরোগের ক্রিম ও মলমের কথা চলে আসে — সেটি সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। এই লেখার ট্রাইকোডার্মা ব্যবহারের নিয়ম মাটির উপকারী ছত্রাক নিয়ে, যা গাছের গোড়া ও শিকড় পচা ঠেকায়।

ট্রাইকোডার্মা আসলে কী

বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক বিজ্ঞানীর ভাষায়, ট্রাইকোডার্মা প্রকৃতি থেকেই পাওয়া একটি অণুজীব — মাটিতে মুক্তভাবে বসবাসকারী উপকারী ছত্রাক, যা গাছের শিকড়ের আশপাশের মাটিতে, পচা আবর্জনায় ও কম্পোস্টে এমনিতেই থাকে।

এটি কীটনাশকের মতো কিছু মারে না। এটি মাটিতে বসবাসকারী ক্ষতিকর জীবাণু — ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া এবং কৃমি বা নেমাটোড — এদের ঘায়েল করে এবং শিকড়ের চারপাশে জায়গা দখল করে রাখে, যাতে রোগের জীবাণু বসতে না পারে। এ কারণেই এটি রোগ হওয়ার আগে কাজে দেয়, হওয়ার পরে নয়।

কোন রোগে কাজ করে

এআইএসে প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, বাজারে থাকা ট্রাইকোডার্মাভিত্তিক প্রস্তুতিগুলো নিচের সমস্যাগুলোয় ব্যবহার হয়:

  • সবজির ঢলে পড়া, শিকড় ও গোড়া পচা এবং পাতায় ঝলসানো রোগ
  • পানের পাতা পচা, কাণ্ড, শিকড় ও গোড়া পচা
  • বীজতলার চারা ঢলে পড়া বা গোড়া পচা — বীজ শোধনের মাধ্যমে
  • বেগুনের ফোমোপসিস ব্লাইট ও আলু-বেগুন-টমেটোর ব্যাকটেরিয়াজনিত ঢলে পড়া

যেসব নামে বাজারে পাবেন: ট্রাইকস্ট 1% ডব্লিউপি, বায়োডার্মা, বাউ-বায়োফানজিসাইড। এআইএসের জৈব বালাইনাশক পরিচিতিতে এগুলোকে অণুজীব বালাইনাশক হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

যেটি এটি করে না

গাছ ইতিমধ্যে ঢলে পড়ে গেলে ট্রাইকোডার্মা দিয়ে সেটি ফেরানো যায় না। মরা গাছ তুলে ফেলাই একমাত্র কাজ। এটি প্রতিরোধের উপকরণ — চারা লাগানোর আগে মাটিতে দেওয়ার জিনিস, রোগ দেখা দেওয়ার পর ছিটানোর জিনিস নয়।

ট্রাইকো-কম্পোস্ট: কখন, কতটা

সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত রূপটি হলো ট্রাইকো-কম্পোস্ট — গোবর, হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা ও অন্যান্য জৈব উপাদানের সঙ্গে ট্রাইকোডার্মা মিশিয়ে পচিয়ে তৈরি জৈবসার। বিএআরআইয়ের সুপারিশ সময় ধরে দেওয়া, আর সময়টাই এখানে আসল।

যে সমস্যার জন্যকখন দিতে হবেমাত্রা
বেগুনের ফোমোপসিস ব্লাইটচারা লাগানোর 3 সপ্তাহ আগেহেক্টরপ্রতি 2.5 টন
আলু, বেগুন, টমেটোর ঢলে পড়াচারা লাগানোর 2 সপ্তাহ আগেহেক্টরপ্রতি 2.5 টন
একই জমির হিসাবে—বিঘাপ্রতি প্রায় 334 কেজি, বা শতকপ্রতি প্রায় 10 কেজি
মাত্রা বিএআরআইয়ের, কৃষি তথ্য সার্ভিসে প্রকাশিত (মাঘ ১৪৩১)। বিঘার হিসাব ১ বিঘা = ৩৩ শতক ধরে; স্থানীয় বিঘা আলাদা হলে হিসাব বদলাবে।

দুই থেকে তিন সপ্তাহের ব্যবধানটা খেয়াল করুন। ট্রাইকোডার্মার মাটিতে ছড়িয়ে বসতে সময় লাগে; চারা লাগানোর দিন কম্পোস্ট দিলে সেই সময়টুকু আর থাকে না। গাছ হলুদ হয়ে ঢলে পড়ার পেছনে গোড়ার রোগ আছে কি না — সেটি যাচাই করে নিলে বোঝা যায় এই খরচটা আপনার জমিতে দরকার কি না।

ট্রাইকো-লিচেট ও বীজ শোধন

দাঁড়ানো ফসলে ব্যবহারের রূপটি হলো ট্রাইকো-লিচেট। বিএআরআইয়ের মাত্রা: প্রতি লিটার পানিতে 20 মিলি, সবজির বাড়ন্ত অবস্থা থেকে শুরু করে 10 থেকে 15 দিন পর পর স্প্রে।

আর বীজতলার জন্য বীজ শোধন। মরিচের চারা ঢলে পড়া ঠেকাতে বিএআরআইয়ের প্রতিকার তালিকায় ট্রাইকোডার্মা দিয়ে বীজ শোধন করে বপনের কথা বলা আছে — নার্সারিতে যে রোগ দুই থেকে চার দিনে সব চারা মেরে ফেলতে পারে, তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে সস্তা পদক্ষেপ এটাই।

ব্যবহারবিধি

মাত্রা — ট্রাইকো-কম্পোস্ট হেক্টরপ্রতি 2.5 টন, চারা লাগানোর 2 থেকে 3 সপ্তাহ আগে মাটিতে। ট্রাইকো-লিচেট প্রতি লিটার পানিতে 20 মিলি, 10 থেকে 15 দিন পর পর। বাজারের প্যাকেটজাত প্রস্তুতির ক্ষেত্রে প্যাকেটের গায়ের মাত্রাই চূড়ান্ত, কারণ ব্র্যান্ডভেদে ঘনত্ব আলাদা।

নিরাপদ ব্যবধান — ট্রাইকোডার্মা জৈব উপকরণ, এর নিজস্ব কোনো অপেক্ষার দিন নেই; প্রয়োগের দিনও ফসল তোলা যায়। তবে একই ক্ষেতে রাসায়নিক ছত্রাকনাশক ব্যবহার করে থাকলে তখন সেই ওষুধের প্যাকেটে ছাপা PHI প্রযোজ্য — ফসল তোলার সম্ভাব্য তারিখ থেকে ওই দিনগুলো পিছিয়ে গুনে শেষ প্রয়োগের দিন ঠিক করুন।

সুরক্ষা সরঞ্জাম — কম্পোস্ট নাড়াচাড়ার সময় হ্যান্ডগ্লাভস ও মুখোশ পরুন; জৈব হলেও শুকনো স্পোর নিঃশ্বাসে টানা ঠিক নয়, বিশেষ করে হাঁপানি থাকলে। কাজ শেষে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন। রাসায়নিক ছত্রাকনাশকের সঙ্গে একই ট্যাঙ্কে মিশাবেন না — তাতে উপকারী ছত্রাকটিই মরে যায়। সাধারণ নিরাপত্তা নিয়ম কৃষি তথ্য সার্ভিসের নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবহার পাতায় আছে।

সূত্র: কৃষি তথ্য সার্ভিস — শীতকালীন সবজির রোগ ও প্রতিকার, কৃষিকথা মাঘ ১৪৩১ (মাত্রা) ও নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবহার (সুরক্ষা) — দেখা হয়েছে ১৮ আগস্ট ২০২৬

যে ভুলগুলোয় কাজ হয় না

ট্রাইকোডার্মা জীবন্ত। মরে গেলে সেটি নিছক কম্পোস্ট, আর তখন রোগ ঠেকানোর কাজটা হয় না। বিএআরআইয়ের নির্দেশনায় সবচেয়ে জোর দেওয়া সতর্কতাটি হলো পানির পরিমাণ — কম্পোস্টের উপাদান মেশানোর সময় পানি বেশি দিলে ট্রাইকোডার্মার অণুবীজের কার্যকারিতা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

  • সরাসরি রোদে রাখা কম্পোস্ট বা প্যাকেট — ছায়ায় ও বাতাস চলাচল করে এমন জায়গায় রাখুন।
  • রাসায়নিক ছত্রাকনাশকের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া — উপকারী ছত্রাকটি টেকে না।
  • রোপণের দিন দেওয়া — মাটিতে বসতে সময় দিতে হয়।
  • অনেক পুরোনো প্যাকেট — জীবন্ত অণুজীবের মেয়াদ থাকে, কেনার সময় তারিখ দেখে নিন।

একটা কথা আলাদা করে বলা দরকার। ট্রাইকোডার্মা মাটিবাহিত রোগের জন্য, বাতাসে ছড়ানো রোগের জন্য নয় — আলুর নাবি ধসা যেভাবে কুয়াশা আর বাতাসে ছড়ায়, সেখানে মাটির উপকারী ছত্রাক কোনো কাজে আসে না। সেটি আলাদা ব্যবস্থাপনা।

আর একটা বাস্তব কথা। ট্রাইকো-কম্পোস্ট গোবরের বিকল্প নয়, এটি জৈব সারের সঙ্গে বাড়তি একটা সুরক্ষা। যে জমিতে বছরের পর বছর একই সবজি হচ্ছে এবং গোড়া পচা ফিরে ফিরে আসছে, খরচটা সেখানেই সবচেয়ে ভালো কাজে লাগে।

সূত্র

কৃষি তথ্য সার্ভিস — “শীতকালীন সবজির রোগ ও প্রতিকার”, কৃষিকথা মাঘ ১৪৩১, প্রকাশ ১২-০১-২০২৫; ড. মোঃ হাফিজুর রহমান, ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট — দেখা হয়েছে ২০২৬-০৮-১৮
কৃষি তথ্য সার্ভিস — “কৃষি কাজে জৈবপদ্ধতি: নিরাপদে থাকুক উদ্ভিদ ও প্রাণী”, কৃষিকথা মাঘ ১৪২৮, প্রকাশ ১৭-০১-২০২২; বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, প্রজনন বিভাগ, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট — দেখা হয়েছে ২০২৬-০৮-১৮
কৃষি তথ্য সার্ভিস — “মরিচের রোগ ও তার প্রতিকার”, কৃষিকথা পৌষ ১৪২২ (বীজ শোধন) — দেখা হয়েছে ২০২৬-০৮-১৮
এই লেখায় ভুল পেয়েছেন? জানান — [email protected] সংশোধন হলে কী বদলেছে ও কোন তারিখে, তা লেখার নিচে লিখে রাখা হয়।
যাচাই করেছেন
কৃষিবিদ জাকারিয়া হোসেন
কৃষিবিদ · ডিসকভারি এগ্রোটেক · যাচাই ৩রা ভাদ্র ১৪৩৩

বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি কাজের অভিজ্ঞতা; খরিফ-১, খরিফ-২ ও রবি — তিন মৌসুম জুড়েই নতুন কৃষি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন।

Scroll to Top