পাতা হলুদ হওয়ার কারণ একটিমাত্র নয়। হলুদ হয়ে যাওয়া নিজে একটি লক্ষণ, আর লক্ষণটির পেছনে অন্তত ছয়-সাতটি আলাদা কারণ থাকতে পারে — সারের অভাব, পানি জমা, শিকড় নষ্ট হওয়া, কিংবা রোগ। কোনটা ঘটছে সেটা না জেনে ইউরিয়া ছিটালে অর্ধেক সময় টাকাটা নষ্ট হয়।
প্রথম প্রশ্নটাই সব ঠিক করে দেয়: পুরোনো পাতা না কচি পাতা
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের বর্ণনা অনুযায়ী এই একটি পার্থক্যেই কারণের বড় ভাগটা ঠিক হয়ে যায়। গাছের নিচের দিকের বয়স্ক পাতা আগে হলুদ হলে বুঝতে হবে নাইট্রোজেনের অভাব। আর উপরের দিকের কচি পাতা আগে ফ্যাকাশে হলে সেটি গন্ধকের অভাব।
কারণটা সহজ। নাইট্রোজেন গাছের ভেতরে চলাচল করতে পারে, তাই ঘাটতি পড়লে গাছ পুরোনো পাতা থেকে টেনে নিয়ে নতুন পাতায় দেয় — পুরোনো পাতা আগে ফ্যাকাশে হয়। গন্ধক ওভাবে সরতে পারে না, তাই নতুন পাতাই আগে ভোগে। মাঠে দাঁড়িয়ে এই একটা জিনিস দেখলেই দুটো সম্পূর্ণ আলাদা সার আলাদা হয়ে যায়।
খাদ্যোপাদানের অভাবে কোন পাতা কীভাবে হলুদ হয়
এসআরডিআইয়ের প্রকাশিত লক্ষণ তালিকাটি সংক্ষেপে:
| যে উপাদানের অভাব | যেভাবে চেনা যায় | যে সার প্রয়োগে সারে |
|---|---|---|
| নাইট্রোজেন | নিচের বয়স্ক পাতা হালকা সবুজ থেকে হলদে; পুরো মাঠ ধীরে ধীরে সমানভাবে হলদে; গাছ খাটো, কুশি কম | ইউরিয়ার উপরিপ্রয়োগ |
| গন্ধক | উপরের কচি পাতা হলদে-সাদা বা ফ্যাকাশে, পরে নিচের দিকে ছড়ায় | জিপসাম |
| দস্তা (জিংক) | কচি পাতার মধ্যশিরা গোড়ার দিকে সাদা; পুরোনো পাতায় মরিচা পড়ার মতো ছোপ, পরে বাদামি | জিংক সালফেট |
| ম্যাগনেসিয়াম | বয়স্ক পাতা হলদে-বিবর্ণ, কিন্তু শিরাগুলো সবুজ থেকে যায় | ডলোচুন |
| পটাশিয়াম | বয়স্ক পাতার আগা ও কিনারা ঝলসে বা পুড়ে যাওয়ার মতো; কাণ্ড লিকলিকে | এমওপি |
| ফসফরাস | হলুদ নয় — পাতা উল্টো গাঢ় সবুজ, কাণ্ডে লালচে বেগুনি আভা | টিএসপি বা ডিএপি |
শিরা সবুজ, না পুরো পাতাই হলুদ?
পাতা হলুদ হলেও শিরাগুলো সবুজ থেকে গেলে সেটি ম্যাগনেসিয়ামের অভাব। এই দুটোর সার সম্পূর্ণ আলাদা। বয়স্ক পাতার আগা-কিনারা পুড়ে যাওয়ার মতো হলে সেটি আবার পটাশিয়াম। একই “হলুদ” শব্দের নিচে তিনটি ভিন্ন সিদ্ধান্ত লুকিয়ে আছে।
যখন কারণটা সারের অভাবই নয়
সার দেওয়ার আগে সস্তা কারণগুলো বাতিল করে নিন। জমিতে পানি জমে থাকলে শিকড় শ্বাস নিতে পারে না, আর গাছ হলুদ হয়ে যায় — এখানে ইউরিয়া দিলে অবস্থা খারাপ হয়, নিকাশ করলে ঠিক হয়।
গোড়ায় সমস্যা হলে লক্ষণটা আলাদা। গোটা মাঠ একসঙ্গে নয়, এক-দুটি গাছ হলুদ হয়ে ঢলে পড়ে। একটি গাছ তুলে গোড়া ও শিকড় দেখুন। পচা বা বিবর্ণ হলে সেটি রোগ। গোড়া ও শিকড় পচা ঠেকাতে ট্রাইকো-কম্পোস্ট কখন দিতে হয় — এটি রোপণের আগের কাজ, পরে নয়।
রস শোষণকারী পোকাতেও পাতা হলদে হয়। জাব পোকার আক্রমণে পাতা কুঁকড়ে হলদে রং ধরে। তবে পাতা কেবল কুঁকড়ালে সেটি আলাদা সমস্যা এবং তার ব্যবস্থাপনাও আলাদা।
আর ব্যাকটেরিয়াজনিত ঢলে পড়ায় গাছ দুপুরে ঢলে পড়ে, সন্ধ্যায় কিছুটা সোজা হয়। কাটা কাণ্ড আধা ঘণ্টা পরিষ্কার পানিতে ডুবিয়ে রাখলে দুধের মতো সাদা ধারা বেরিয়ে আসে — বিএআরআইয়ের এই পরীক্ষাটি ঘরেই করা যায় এবং এতে কোনো সার লাগে না।
ফসলভেদে যেটা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়
- ধান। রোপণের পর কচি পাতা ফ্যাকাশে হলে দস্তার অভাব সন্দেহ করুন; পুরো মাঠ সমানভাবে হলদে হলে নাইট্রোজেন।
- বেগুন ও টমেটো। এক-দুটি গাছ হলুদ হয়ে ঢলে পড়া প্রায়ই ঢলে পড়া রোগ; খাদ্যোপাদানের ঘাটতি সেখানে দ্বিতীয় সন্দেহ।
- শসা ও লাউ জাতীয়। পাতার নিচে সাদা মাছি বা জাব পোকা দেখুন; সেই সঙ্গে গোড়ায় পানি জমছে কি না।
- টবের গাছ। টবে নিকাশের ছিদ্র বন্ধ হয়ে গেলে সবার আগে নিচের পাতা হলুদ হয়। সার কেনার আগে ছিদ্রটা দেখুন।
সার কেনার আগে যে কাজটি টাকা বাঁচায়
লক্ষণ দেখে সার দেওয়াটা দ্বিতীয় সেরা পদ্ধতি। প্রথম পদ্ধতি হলো মাটি পরীক্ষা করানো, অথবা মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের উপজেলা নির্দেশিকা থেকে নিজের জমির উর্বরতা মান জেনে নেওয়া — লক্ষণ ফুটে ওঠার আগেই সার দেওয়া যায়, আর ফলন বিপর্যয়টাই ঘটে না।
কারণ লক্ষণ যখন চোখে পড়ে, ক্ষতি ততক্ষণে কিছুটা হয়ে গেছে। এসআরডিআইয়ের নির্দেশনাটি এ কথাটাই স্পষ্ট করে বলছে — প্রতিরোধ প্রতিকারের চেয়ে সস্তা।
আর একটি অভ্যাস। হলুদ পাতা দেখলে সঙ্গে সঙ্গে ছবি তুলে রাখুন, কোন পাতা আগে ধরেছে সেটাসহ। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে দেখানোর সময় ওই একটি ছবি দশটা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেয়।
