ডিসকভারি এগ্রোটেক
রোগ ও পোকা

নিম তেল স্প্রে করার নিয়ম ও নিরাপদ মাত্রা

নিম তেল স্প্রে করার নিয়ম সহজ, ভুলটা হয় মাত্রায়। বিএআরআইয়ের সুপারিশ প্রতি লিটার পানিতে 1 থেকে 2 মিলি নিম তেল, সামান্য সাবানসহ, 10 দিন পর পর। স্প্রে সকালে বা বিকেলে, পাতার নিচের দিক ভিজিয়ে। ঘন করে মেশালে বা রোদে দিলে পাতা পুড়ে যায়।

এক হাতে সিরিঞ্জে অল্প পরিমাণ হলদেটে নিম তেল মেপে এক লিটারের স্প্রে বোতলে ঢালা হচ্ছে; পেছনে সবজির চারা।
প্রতি লিটার পানিতে 1 থেকে 2 মিলি — নিম তেল চোখের আন্দাজে নয়, সিরিঞ্জে মেপে নেওয়াই নিরাপদ।

নিম তেল স্প্রে করার নিয়ম নিয়ে সবচেয়ে বেশি যে ভুলটা হয়, সেটা মাত্রার। “জৈব জিনিস, বেশি দিলে ক্ষতি নেই” ভেবে ঘন করে মেশালে পাতা পুড়ে যায় — আর তখন দোষ পড়ে নিম তেলের ঘাড়ে।

প্রতি লিটারে কতটুকু

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সুপারিশ, কৃষি তথ্য সার্ভিসে প্রকাশিত: সবজির বাহক পোকা দমনে প্রতি লিটার পানিতে 1 থেকে 2 মিলি নিম বা সরিষার তেল, 10 দিন পর পর স্প্রে।

সংখ্যাটা কম। অনেকের ধারণার চেয়ে অনেকটাই কম। এক লিটারের সাধারণ হ্যান্ড স্প্রেয়ারে এক চা-চামচের এক-তৃতীয়াংশের কম — চোখের আন্দাজে ঢাললে সহজেই তিন-চার গুণ বেশি পড়ে যায়। ওষুধ মাপার সিরিঞ্জ বা ড্রপার দিয়ে মাপুন।

স্প্রেয়ারের পানিনিম তেল (1 মিলি/লিটার হারে)নিম তেল (2 মিলি/লিটার হারে)
1 লিটার1 মিলি2 মিলি
5 লিটার5 মিলি10 মিলি
10 লিটার10 মিলি20 মিলি
16 লিটার (সাধারণ ন্যাপস্যাক)16 মিলি32 মিলি
মাত্রা বিএআরআইয়ের, কৃষি তথ্য সার্ভিসে প্রকাশিত (মাঘ ১৪৩১)। প্রথমবার হলে কম মাত্রা দিয়ে শুরু করুন।

অন্য মাত্রা লেখা দেখলে

অনলাইনে ও দোকানে প্রায়ই প্রতি লিটারে 5 মিলি পর্যন্ত মাত্রা বলা হয়। বাংলাদেশের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সুপারিশে আমরা সেই সংখ্যাটি পাইনি — যেটি পেয়েছি তা 1 থেকে 2 মিলি। প্যাকেটজাত বাণিজ্যিক নিম তেলের ঘনত্ব আলাদা হতে পারে, তাই সেক্ষেত্রে প্যাকেটের গায়ের মাত্রাই মানুন। আর কোনো ক্ষেত্রেই দুটো মাত্রা যোগ করবেন না।

তেল পানিতে মেশে না — সাবান কেন লাগে

নিম তেল পানিতে গুলে যায় না, ভেসে থাকে। সাবান বা ডিটারজেন্ট সামান্য মিশিয়ে দিলে তেল-পানি একসঙ্গে মিশে থাকে এবং পাতায় সমানভাবে লাগে। এআইএসের ঐতিহ্যবাহী নিম প্রস্তুতিগুলোতেও গুঁড়া সাবান মেশানোর কথা আছে।

  • প্রথমে অল্প কুসুম গরম পানিতে সাবান গুলে নিন, তারপর নিম তেল ঢেলে ভালো করে নাড়ুন।
  • তারপর বাকি পানি ঢালুন।
  • স্প্রে করার সময় মাঝে মাঝে ঝাঁকিয়ে নিন — না হলে শেষ দিকের গাছগুলো ঘন মিশ্রণ পায়।
  • মিশ্রণ বানিয়ে রেখে দেবেন না; যেদিন গুলবেন সেদিনই শেষ করুন।

কখন স্প্রে করবেন, কখন করবেন না

সময়টা মাত্রার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। ভরদুপুরের রোদে তেলমাখা পাতা পুড়ে যায়, তাই স্প্রে সকালে বা বিকেলের পড়ন্ত রোদে। বৃষ্টির আগে দিলে সব ধুয়ে যায়। তখন আবার দিতে হয়।

আর পাতার নিচের দিকটা ভেজানো চাই। সাদা মাছি, জাব পোকা আর মাকড় সবাই পাতার নিচে বসে; উপর থেকে ছিটিয়ে গেলে তারা ভিজবেই না। এ কারণেই নিম তেল প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় সবচেয়ে ভালো কাজ করে — সাদা মাছি ভাইরাস ছড়ানোর আগেই ঠেকাতে হয়, ছড়িয়ে যাওয়ার পর নয়।

ব্যবহারবিধি

মাত্রা — প্রতি লিটার পানিতে 1 থেকে 2 মিলি নিম তেল, সঙ্গে সামান্য গুঁড়া সাবান, 10 দিন পর পর। সিরিঞ্জ বা ড্রপারে মেপে নিন। নতুন জাত বা নতুন ফসলে প্রথমবার দেওয়ার আগে দু-তিনটি গাছে দিয়ে 2 দিন দেখে নিন পাতা পুড়ছে কি না।

নিরাপদ ব্যবধান — নিম তেল উদ্ভিদজাত এবং পরিবেশে দ্রুত ভেঙে যায়, তাই প্রাতিষ্ঠানিক সুপারিশে এর জন্য আলাদা অপেক্ষার দিন ধরা হয়নি। তবু স্প্রের পর অন্তত 3 দিন সবজি না তোলাই নিরাপদ অভ্যাস, আর তোলার পর ভালো করে ধুয়ে নিন। প্যাকেটজাত বাণিজ্যিক প্রস্তুতিতে অন্য উপাদান মেশানো থাকতে পারে — সেক্ষেত্রে প্যাকেটে ছাপা PHI-এর দিনগুলো ফসল তোলার তারিখ থেকে পিছিয়ে গুনে শেষ প্রয়োগের দিন ঠিক করুন।

সুরক্ষা সরঞ্জাম — হ্যান্ডগ্লাভস, মুখোশ ও চশমা; নিম তেল চোখে ও চামড়ায় জ্বালা ধরায়। ফুলহাতা জামা পরুন, বাতাসের অনুকূলে স্প্রে করুন, কাজ শেষে সাবান দিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে নিন। মৌমাছি সক্রিয় থাকা অবস্থায় ফুল ফোটা গাছে স্প্রে করবেন না — বিকেলে দিন। স্প্রে মেশিন পুকুর বা নালায় ধোবেন না। সাধারণ নিয়মগুলো কৃষি তথ্য সার্ভিসের নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবহার পাতায় দেওয়া আছে।

সূত্র: কৃষি তথ্য সার্ভিস — শীতকালীন সবজির রোগ ও প্রতিকার, কৃষিকথা মাঘ ১৪৩১ (মাত্রা ও ব্যবধান) ও নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবহার (সুরক্ষা) — দেখা হয়েছে ১৮ আগস্ট ২০২৬

কোন পোকায় কাজ করে, কোনটায় করে না

নিম তেল রস শোষণকারী নরম দেহের পোকায় সবচেয়ে ভালো কাজ করে — জাব পোকা, সাদা মাছি, থ্রিপস, মাকড়। এগুলোর জন্যই এটি বাহক পোকা দমনের তালিকায় আছে।

কিন্তু যে পোকা ফলের বা কাণ্ডের ভেতরে ঢুকে যায়, নিম তেল তার গায়ে পৌঁছায় না। বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার জন্য যেভাবে ফেরোমন ফাঁদ আর ডগা ছাঁটাই কাজে লাগে, সেটি সম্পূর্ণ আলাদা পথ। কুমড়ার ফলের মাছি পোকায় আবার বিষটোপই মূল ব্যবস্থা।

এবং এটি একদিনের ওষুধ নয়। এআইএসের জৈব বালাইনাশক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে জৈব উপকরণ পরিবেশে দ্রুত নিঃশেষ হয় বলে কোনো অবশেষ থাকে না — সুবিধাটা যেমন এটাই, অসুবিধাটাও। বারবার দিতে হয়।

পাতা পুড়ে গেলে বুঝবেন কোথায় ভুল হয়েছে

পাতার কিনারা বাদামি হয়ে শুকিয়ে গেলে সাধারণত তিনটির একটি ঘটেছে: মাত্রা বেশি হয়েছে, রোদ থাকা অবস্থায় স্প্রে হয়েছে, অথবা সাবান বেশি পড়েছে। বিএআরআইয়ের মাত্রাটি মেনে বিকেলে দিলে এই তিনটিই এড়ানো যায়।

গাছ বাঁচাতে হলে সঙ্গে সঙ্গে পরিষ্কার পানি দিয়ে পাতা ধুয়ে দিন, আর পরের স্প্রেটা অর্ধেক মাত্রায়। পোড়া পাতা আর সবুজ হবে না। নতুন পাতা স্বাভাবিকই বেরোবে।

সূত্র

কৃষি তথ্য সার্ভিস — “শীতকালীন সবজির রোগ ও প্রতিকার”, কৃষিকথা মাঘ ১৪৩১, প্রকাশ ১২-০১-২০২৫; ড. মোঃ হাফিজুর রহমান, ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট — প্রতি লিটারে ১-২ মিলি নিম/সরিষার তেল, ১০ দিন পর পর — দেখা হয়েছে ২০২৬-০৮-১৮
কৃষি তথ্য সার্ভিস — “কৃষি কাজে জৈবপদ্ধতি: নিরাপদে থাকুক উদ্ভিদ ও প্রাণী”, কৃষিকথা মাঘ ১৪২৮, প্রকাশ ১৭-০১-২০২২; বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট — দেখা হয়েছে ২০২৬-০৮-১৮
কৃষি তথ্য সার্ভিস — “নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবহার” — দেখা হয়েছে ২০২৬-০৮-১৮
এই লেখায় ভুল পেয়েছেন? জানান — [email protected] সংশোধন হলে কী বদলেছে ও কোন তারিখে, তা লেখার নিচে লিখে রাখা হয়।
যাচাই করেছেন
কৃষিবিদ জাকারিয়া হোসেন
কৃষিবিদ · ডিসকভারি এগ্রোটেক · যাচাই ৩রা ভাদ্র ১৪৩৩

বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি কাজের অভিজ্ঞতা; খরিফ-১, খরিফ-২ ও রবি — তিন মৌসুম জুড়েই নতুন কৃষি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন।

Scroll to Top