ডিসকভারি এগ্রোটেক
রোগ ও পোকা

মরিচ গাছের পাতা কোকড়ানো রোগের কারণ ও করণীয়

মরিচের পাতা কোকড়ানো দুই কারণে হয়। সাদা মাছির ছড়ানো ভাইরাসে পাতা পুরু ও গুচ্ছাকৃতির হয়, গাছ খর্বাকৃতি হয়ে যায় — এর কোনো ওষুধ নেই, গাছ তুলে ফেলতে হয়। আর থ্রিপস বা জাব পোকার আক্রমণে পাতা বেঁকে যায়, পোকা দমন করলে নতুন পাতা স্বাভাবিক হয়ে আসে।

মরিচ গাছের ডগার পাতাগুলো কুঁকড়ে পুরু হয়ে ছোট গুচ্ছ তৈরি করেছে, আঙুলে ধরা; ডগার পর্ব কাছাকাছি ও গাছ খর্বাকৃতি।
পাতা কুঁকড়ে ছোট ও গুচ্ছাকৃতির — ভাইরাসজনিত পাতা কোকড়ানোয় গাছের পর্বগুলোও কাছাকাছি হয়ে যায়।

মরিচ ক্ষেতে পাতা কোকড়ানো দেখা দিলে বেশির ভাগ চাষি প্রথমেই ওষুধের দোকানে যান। কিন্তু দোকান থেকে কী কিনবেন, সেটা নির্ভর করে কারণটা কী তার উপর — আর কারণ দুটি, একেবারে আলাদা। একটির ওষুধ আছে, অন্যটির নেই।

পাতা কোকড়ানোর দুই আলাদা কারণ

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মসলা গবেষণা কেন্দ্র মরিচের পাতা কুঁকড়ানোকে একটি ভাইরাসজনিত রোগ হিসেবে বর্ণনা করে, যা ছড়ায় সাদা মাছি (Bemisia tabaci) ও থ্রিপসের মাধ্যমে। ভাইরাস একবার গাছে ঢুকলে সেই গাছ আর সারে না।

আবার থ্রিপস বা জাব পোকা নিজেরাই রস শুষে পাতা বিকৃত করে দেয় — সেখানে ভাইরাস নেই। এ ক্ষেত্রে পোকা দমন হলে গাছের নতুন পাতা স্বাভাবিক হয়ে আসে। তাই মাঠে প্রথম কাজ ওষুধ কেনা নয়, দেখে ঠিক করা কোনটা ঘটছে।

ভাইরাস না পোকা — মাঠে দাঁড়িয়ে যেভাবে আলাদা করবেন

একটি গাছের কয়েকটি পাতা হাতে নিয়ে উল্টে দেখুন। পার্থক্যগুলো চোখে পড়ার মতো।

যা দেখছেনভাইরাসজনিত পাতা কোকড়ানোথ্রিপস বা জাব পোকার ক্ষতি
পাতার পুরুত্বস্বাভাবিক পাতার চেয়ে পুরুপুরু হয় না, বরং শুকিয়ে যায়
পাতার গড়নছোট, গুচ্ছাকৃতিরউপরের দিকে বেঁকে যায়, কিনারা বিকৃত
গাছের গড়নপর্ব কাছাকাছি, গাছ খর্বাকৃতি ও ঝোপের মতোগাছের উচ্চতা মোটামুটি ঠিক থাকে
রংসবুজই থাকেজাব পোকায় হলদে রং ধরে
ফলছোট ও কুঁকড়ানো, ফল ধারণ কমে যায়ফুল ঝরে, তবে ধরা ফল স্বাভাবিক
নতুন পাতাপোকা মেরেও ঠিক হয় নাপোকা দমনের পর স্বাভাবিক হয়
লক্ষণের তুলনা, বিএআরআই মসলা গবেষণা কেন্দ্রের বর্ণনা অনুসারে।

সবচেয়ে নিশ্চিত পরীক্ষা

একবার বাহক পোকা দমন করে 10 দিন অপেক্ষা করুন। এর মধ্যে যে পাতাগুলো নতুন বেরোবে সেগুলো যদি স্বাভাবিক হয়, সমস্যা ছিল পোকা। আর নতুন পাতাও যদি ছোট ও গুচ্ছাকৃতির হয়ে বেরোয়, তবে গাছটি ভাইরাসে আক্রান্ত এবং সেটি আর ফিরবে না।

ভাইরাস হলে যা করতে হবে, আর যা করে লাভ নেই

ভাইরাসের কোনো ছত্রাকনাশক বা কীটনাশক নেই। বাজারে যত ওষুধই দেখানো হোক, আক্রান্ত গাছটি সারানো যায় না — কাজেই খরচটা বাঁচান। যেটা করা যায় তা হলো ভাইরাসকে বাকি ক্ষেতে ছড়াতে না দেওয়া।

  • আক্রান্ত গাছ শিকড়সহ তুলে ক্ষেতের বাইরে নিয়ে পুড়িয়ে বা পুঁতে ফেলুন — ফেলে রাখলে সেটি বাহক পোকার আস্তানা হয়ে থাকে।
  • আশপাশের পোষক আগাছাও তুলে ফেলুন; বিএআরআই এটিকে প্রতিকারের তালিকায় রেখেছে।
  • পরের মৌসুমের বীজ কখনোই আক্রান্ত গাছ থেকে নেবেন না, কেবল সুস্থ গাছ থেকে নিন।
  • রোগাক্রান্ত চারা কোনো অবস্থাতেই মাঠে লাগানো যাবে না।

একটা কথা পরিষ্কার থাকা দরকার। পাতা কেবল হলুদ হয়ে গেলে সেটি প্রায়ই খাদ্যোপাদানের অভাব, কোকড়ানো নয় — দুটোকে গুলিয়ে ফেলে ইউরিয়া দিলে ভাইরাস আরও দ্রুত ছড়ায়, কারণ কচি ডগায় সাদা মাছি বেশি বসে।

বাহক পোকা দমনের ধাপ

বিএআরআইয়ের মসলা গবেষণা কেন্দ্রের 2026 সালের সুপারিশে বাহক দমন শুরু হয় ফাঁদ দিয়ে, কীটনাশক দিয়ে নয়। ক্ষেতে হলুদ আঠালো ফাঁদ বসান — সাদা মাছির জন্য হলুদ, থ্রিপসের জন্য সাদা ও নীল। ফাঁদ কত দূরে দূরে বসাতে হয় ও কোন ফসলে কোনটি — নিয়মটা এক নয়।

তারপর জৈব বালাইনাশক। এআইএসে প্রকাশিত সুপারিশে সাদা মাছির জন্য বায়োম্যাক্স 1 মিলি, বায়োট্রিন 1.5 মিলি, ট্রেসার 0.4 মিলি বা সাকসেস 1.2 মিলি — প্রতি লিটার পানিতে। নিম তেল কত মাত্রায় আর কত দিন পর পর দিতে হয় সেটিও এই ধাপেই আসে।

আক্রমণ এর পরেও বাড়তে থাকলে অনুমোদিত কীটনাশক। মাত্রা প্রতি লিটার পানিতে:

বাহক পোকাঅনুমোদিত কীটনাশকমাত্রা / লিটার পানি
সাদা মাছিইমিডাক্লোপ্রিড জাতীয় (এডমায়ার 20 এসএল, ইমিটাফ 20 এসএল, টিডো 20 এসএল)0.5 মিলি
সাদা মাছিডায়াফেনথিউরন জাতীয় (পেগাসাস 50 এসসি)1 মিলি
থ্রিপসক্লোরফিনাপির জাতীয় (ইনটিপ্রিড 10 এসসি)1 মিলি
থ্রিপসইমিডাক্লোপ্রিড জাতীয়0.5 মিলি
বিএআরআই মসলা গবেষণা কেন্দ্রের সুপারিশ, কৃষি তথ্য সার্ভিসে প্রকাশিত (মাঘ ১৪৩২)।

ব্যবহারবিধি

মাত্রা — তালিকা থেকে একটি কীটনাশক বেছে নিন, দুটি মিশিয়ে নয়। ট্যাঙ্কে কত লিটার পানি ধরছে সেটা গুনে মাত্রা গুণ করুন; বোতলের ঢাকনার আন্দাজে মাপবেন না। একই ওষুধ বারবার না দিয়ে গ্রুপ বদলে দিন, নইলে সাদা মাছি সহনশীল হয়ে ওঠে।

নিরাপদ ব্যবধান — মরিচ তোলার সম্ভাব্য তারিখ থেকে প্যাকেটে ছাপা PHI-এর দিনগুলো পিছিয়ে গুনুন; যে তারিখটি পাবেন, সেটিই শেষ স্প্রের শেষ দিন। মরিচ বারবার তোলা হয় বলে এ হিসাবটা এখানে আরও জরুরি। এআইএসের এই প্রকাশনায় PHI ছাপা নেই, তাই সংখ্যাটি প্যাকেট থেকে বা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে নিন। অনুমান করবেন না।

সুরক্ষা সরঞ্জাম — এপ্রোন, গামবুট, মুখোশ, চশমা, হ্যান্ডগ্লাভস ও ক্যাপ; না পেলে গামছা, ফুলহাতা শার্ট ও পায়জামা। স্প্রে সকালে বা বিকেলে, সবসময় বাতাসের অনুকূলে। ছিটানোর পর ক্ষেতে নিশান পুঁতে দিন যাতে মানুষ ও গরু-ছাগল ঢুকে না পড়ে। খালি প্যাকেট মাটিতে পুঁতে ফেলুন, স্প্রে মেশিন পুকুরে ধোবেন না। নিয়মগুলো কৃষি তথ্য সার্ভিসের নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবহার পাতা অনুসরণ করে।

সূত্র: কৃষি তথ্য সার্ভিস — মরিচের পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা, কৃষিকথা মাঘ ১৪৩২ (মাত্রা) ও নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবহার (সুরক্ষা) — দেখা হয়েছে ১৮ আগস্ট ২০২৬

চারা অবস্থাতেই ঠেকানোর কাজগুলো

মাঠে ভাইরাস ঢুকে যাওয়ার পর করার কিছু থাকে না বলে আসল লড়াইটা বীজতলাতেই। বিএআরআইয়ের সুপারিশ হলো চারা অবস্থায় বীজতলা মশারির নেট দিয়ে ঢেকে রাখা, যাতে সাদা মাছি চারায় বসতেই না পারে। খরচ সামান্য, আর একবার কেনা নেট কয়েক মৌসুম চলে।

এর সঙ্গে ক্ষেত পরিষ্কার রাখা, সুস্থ গাছ থেকে বীজ নেওয়া আর নিয়মিত ক্ষেত হাঁটা — এই তিনটে অভ্যাস মিলে যা ঠেকায়, কোনো স্প্রে তা ঠেকাতে পারে না। এআইএসের সাম্প্রতিক ব্যবস্থাপনা নির্দেশনা পোকা দেখা দেওয়ার আগেই ফাঁদ বসানোর কথা বলছে, পরে নয়।

গাছ তুলে ফেলা কষ্টকর সিদ্ধান্ত। কিন্তু একটি আক্রান্ত গাছ রেখে দিলে সেটি থেকে সাদা মাছি ভাইরাস নিয়ে পুরো ক্ষেতে ছড়ায় — বিশটি গাছ বাঁচাতে একটি গাছ হারানোই সস্তা।

সূত্র

কৃষি তথ্য সার্ভিস — “মরিচের পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা”, কৃষিকথা মাঘ ১৪৩২, প্রকাশ ২০-০১-২০২৬; ড. মোঃ জুলফিকার হায়দার প্রধান, মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (কীটতত্ত্ব), মসলা গবেষণা কেন্দ্র, বিএআরআই — দেখা হয়েছে ২০২৬-০৮-১৮
কৃষি তথ্য সার্ভিস — “মরিচের রোগ ও তার প্রতিকার”, কৃষিকথা পৌষ ১৪২২, প্রকাশ ১৭-০১-২০১৬; ড. কে এম খালেকুজ্জামান, ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব), মসলা গবেষণা কেন্দ্র, বিএআরআই — দেখা হয়েছে ২০২৬-০৮-১৮
কৃষি তথ্য সার্ভিস — “নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবহার” — দেখা হয়েছে ২০২৬-০৮-১৮
এই লেখায় ভুল পেয়েছেন? জানান — [email protected] সংশোধন হলে কী বদলেছে ও কোন তারিখে, তা লেখার নিচে লিখে রাখা হয়।
যাচাই করেছেন
কৃষিবিদ জাকারিয়া হোসেন
কৃষিবিদ · ডিসকভারি এগ্রোটেক · যাচাই ৩রা ভাদ্র ১৪৩৩

বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি কাজের অভিজ্ঞতা; খরিফ-১, খরিফ-২ ও রবি — তিন মৌসুম জুড়েই নতুন কৃষি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন।

Scroll to Top