আলুর নাবি ধসা বাংলাদেশে আলু উৎপাদনের প্রধান অন্তরায় — বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ভাষায় ঠিক এই কথাটাই লেখা আছে। রোগটির বৈশিষ্ট্য হলো গতি। অনুকূল আবহাওয়া পেলে দুই থেকে তিন দিনের মধ্যেই গোটা ক্ষেতের গাছ মরে যেতে পারে।
বানানটা দুরকম লেখা হয় — নাবি ধসা, নাবী ধ্বসা। ইংরেজিতে লেইট ব্লাইট, আর গ্রামে সবচেয়ে চেনা নামটা মড়ক।
মাঠে যেভাবে চিনবেন
সকালবেলা ক্ষেতে গেলে সবচেয়ে নিশ্চিত লক্ষণটি চোখে পড়ে: আক্রান্ত পাতার নিচে সাদা পাউডারের মতো জীবাণুর আস্তরণ। দিন গড়ালে সেটি শুকিয়ে যায়, তাই দেখার সময় সকাল।
- পাতায় পানিভেজা দাগ, পরে দাগ বড় হয়ে পাতা পচে যায়।
- ঠান্ডা ও কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ায় আক্রান্ত গাছ দ্রুত পচে যায়।
- আক্রান্ত আলুর গায়ে বাদামি থেকে কালচে দাগ পড়ে এবং সেই আলু খাওয়ার অযোগ্য হয়ে যায়।
একটা পার্থক্য জেনে রাখা দরকার। আগাম ধসায় পাতায় বলয় আকারের বাদামি দাগ পড়ে এবং গাছ ধীরে ধীরে ঝলসায়; নাবি ধসা আসে দ্রুত, ভেজা পচা চেহারায়, আর পাতার নিচে ওই সাদা আস্তরণ থাকে।
যে আবহাওয়ায় ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি
বিএআরআই ঝুঁকির শর্তগুলো সংখ্যায় দিয়েছে, আর এগুলো জানা থাকলে আগাম স্প্রের সিদ্ধান্ত আন্দাজে নিতে হয় না।
| শর্ত | যে মাত্রায় ঝুঁকি |
|---|---|
| সময়কাল | নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি (মধ্য কার্তিক থেকে মধ্য ফাল্গুন) |
| রাতের তাপমাত্রা | 10–16 ডিগ্রি সেলসিয়াস |
| দিনের তাপমাত্রা | 16–23 ডিগ্রি সেলসিয়াস |
| আর্দ্রতা | 90 শতাংশের বেশি, কুয়াশাচ্ছন্ন ভেজা আবহাওয়া |
| যে মিলনে মহামারী | কুয়াশার সঙ্গে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি — 2 থেকে 3 দিনে মহামারী আকার |
পূর্বাভাসই স্প্রের সংকেত
বিএআরআইয়ের নির্দেশনা স্পষ্ট: নিম্ন তাপমাত্রা, কুয়াশা ও বৃষ্টির পূর্বাভাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিরোধমূলক স্প্রে শুরু করতে হবে। রোগের দাগ দেখে অপেক্ষা করলে দেরি হয়ে যায় — কারণ ততক্ষণে ছড়ানো শুরু হয়ে গেছে।
রোপণের সিদ্ধান্তেই অর্ধেক লড়াই
রবি মৌসুমের সবচেয়ে সস্তা প্রতিরোধটা কোনো ওষুধ নয়, তারিখ। বিএআরআইয়ের সুপারিশ — 15 নভেম্বরের মধ্যে আলু রোপণ করা, অথবা আগাম জাত চাষ করা। এতে রোগের মাত্রা অনেকটাই কমানো সম্ভব, কারণ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কুয়াশার সময়টা আসার আগেই গাছ পরিণত হয়ে যায়।
- রোগ সহনশীল জাত: বারি আলু-৪৬, বারি আলু-৫৩, বারি আলু-৭৭।
- রোগমুক্ত প্রত্যায়িত বীজ ব্যবহার করতেই হবে।
- সারি থেকে সারি 60 সেন্টিমিটার; আস্ত বীজ আলুর ক্ষেত্রে আলু থেকে আলু 25 সেন্টিমিটার, কাটা আলুতে 15 সেন্টিমিটার।
- সারিতে ভালো করে মাটি উঁচু করে দিন; সেচের পর গোড়ার মাটি সরে গেলে আবার ঢেকে দিন।
- মৌসুমজুড়ে নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন করুন, সপ্তাহে অন্তত দুবার।
মাটি উঁচু করার কাজটা শুধু গাছের জন্য নয়। মাটির নিচের আলুতে জীবাণু পৌঁছানো ঠেকায় এটাই — আর সেচের পর গাছ হলুদ হয়ে যাওয়ার কারণ খুঁজতে গিয়ে অনেকে এই কাজটা বাদ দিয়ে ফেলেন।
রোগ দেখা দিলে ছত্রাকনাশকের সূচি
বিএআরআইয়ের ব্যবস্থাপনা তিন ধাপে সাজানো, আর ধাপ বদলায় ব্যবধান দিয়ে। প্রথম কাজ: আক্রান্ত জমিতে রোগ নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত সেচ বন্ধ রাখা।
| অবস্থা | ব্যবধান | অনুমোদিত ছত্রাকনাশক ও মাত্রা (প্রতি লিটার পানিতে) |
|---|---|---|
| রোগ আসার আগে, পূর্বাভাস পেয়ে | 7–10 দিন | ম্যানকোজেব গ্রুপ — ডাইথেন এম-45, ইন্ডোফিল এম-45 বা পেনকোজেব 80 ডব্লিউপি, 2 গ্রাম |
| নিজের বা পাশের ক্ষেতে রোগ দেখা দিলে | 7 দিন, পর্যায়ক্রমে গ্রুপ বদলে | এক্রোবেট এম জেড 2 গ্রাম, বা সিকিউর 600 ডব্লিউজি 2 গ্রাম, বা মেলোডি ডুও 66.8 ডব্লিউপি 2 গ্রাম, বা জ্যামপ্রো ডি এম 2 মিলি, বা কার্জেট এম 8 — 2 গ্রাম, বা ফুলিমেইন 60 ডব্লিউপি 2 গ্রাম |
| দীর্ঘ কুয়াশা ও ব্যাপক আক্রমণ | 5 দিন | মিশ্রণ — এক্রোবেট এম জেড 4 গ্রাম + সিকিউর 600 ডব্লিউজি 1 গ্রাম, বা এক্রোবেট এম জেড 4 গ্রাম + মেলোডি ডুও 1 গ্রাম, বা মেলোডি ডুও 4 গ্রাম + সিকিউর 1 গ্রাম |
ব্যবহারবিধি
মাত্রা — তালিকার যেকোনো একটি ওষুধ, উপরের মাত্রায় প্রতি লিটার পানিতে। পর পর একই গ্রুপ নয় — পর্যায়ক্রমে গ্রুপ বদলান, নইলে ছত্রাক সহনশীল হয়ে ওঠে। পাতার উপরে ও নিচে দুদিকেই ভালোভাবে ভিজিয়ে দিন; সাধারণ স্প্রেয়ারের বদলে পাওয়ার স্প্রেয়ারে ফল ভালো হয়। ট্যাঙ্কের লিটার গুনে মাত্রা গুণ করুন।
নিরাপদ ব্যবধান — আলু তোলার সম্ভাব্য তারিখ থেকে প্যাকেটে ছাপা PHI-এর দিনগুলো পিছিয়ে গুনুন; যে তারিখটি পাবেন, সেটিই শেষ স্প্রের শেষ দিন। এআইএসের এই প্রকাশনায় PHI ছাপা নেই, তাই সংখ্যাটি প্যাকেট থেকে বা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে নিন। এর সঙ্গে আলাদা একটি নিয়ম: ফসল তোলার 7 থেকে 10 দিন আগে গাছের পাতা ধ্বংস করতে হয়, যাতে জীবাণু আলুতে না নামে।
সুরক্ষা সরঞ্জাম — হাত মোজা, সানগ্লাস, মাস্ক ও এপ্রোন; বিএআরআই এই চারটির নাম ধরে বলেছে। সবসময় বাতাসের অনুকূলে স্প্রে করুন। গাছ ভেজা অবস্থায় জমিতে ছত্রাকনাশক স্প্রে না করাই ভালো; একান্তই করতে হলে প্রতি লিটার পানিতে 2 গ্রাম সাবানের গুঁড়া মিশিয়ে নিন। ছিটানোর পর ক্ষেতে নিশান পুঁতে দিন যাতে মানুষ ও গরু-ছাগল ঢুকে না পড়ে। খালি প্যাকেট মাটিতে পুঁতে ফেলুন, স্প্রে মেশিন পুকুরে ধোবেন না। বাকি নিয়ম কৃষি তথ্য সার্ভিসের নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবহার পাতায়।
সূত্র: কৃষি তথ্য সার্ভিস — আলুর মড়ক রোগ ও তার প্রতিকার, তথ্যসূত্র বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (মাত্রা ও সুরক্ষা) — দেখা হয়েছে ১৮ আগস্ট ২০২৬
ফসল তোলা ও সংরক্ষণের সতর্কতা
রোগটা মাঠেই শেষ হয় না, গুদামেও যায়। বিএআরআইয়ের সংরক্ষণ নির্দেশনা অনুযায়ী বৃষ্টির পরপর ভেজা অবস্থায় আলু না তুলে মাটিতে জো এলে তোলা উচিত, আর রোগাক্রান্ত গাছ দিয়ে আলুর স্তূপ ঢেকে রাখা যাবে না।
হিমাগারে পাঠানোর আগে বীজ বাছাই করুন খুব সতর্কভাবে — একটি আক্রান্ত আলু বস্তার ভেতরে গিয়ে বাকিগুলো নষ্ট করে। মাটিবাহিত রোগ ঠেকাতে রোপণের আগে ট্রাইকো-কম্পোস্ট দেওয়ার নিয়মটি এই ফসলে পরের মৌসুমের প্রস্তুতির অংশ।
আর যে অভ্যাসটি কিছুই খরচ করায় না: বিএআরআইয়ের পুরো নির্দেশিকাটি একবার পড়ে নিয়ে নভেম্বরের আবহাওয়ার পূর্বাভাসে চোখ রাখা। এই রোগে আগে জানাটাই আসল ওষুধ।
