ডিসকভারি এগ্রোটেক
রোগ ও পোকা

আমন ধানের মাজরা পোকা চেনা ও দমনের সময়

আমন ধানে মাজরা পোকা শুধু কীড়া অবস্থায় ক্ষতি করে — শীষ আসার আগে ডিগ কাটলে মরা ডিগ, পরে কাটলে মরা শীষ। ব্রি বলছে, ১০-১৫% মরা ডিগ বা ৫% মরা শীষ না পেরোলে কীটনাশক লাগে না; তার আগে ডিমের গাদা সংগ্রহ, ডালপালা পুঁতে পাখি বসানো আর আলোক ফাঁদই যথেষ্ট।

সবুজ আমন ধানের ঝাড় থেকে হাত দিয়ে টেনে তোলা হচ্ছে একটি শুকনো বাদামি ডিগ, যেটি গোড়া থেকে আলগা হয়ে উঠে আসছে; চারপাশে পানি জমা ধানক্ষেত।
মাঝের ডিগ শুকিয়ে বাদামি — মাজরা পোকার কীড়া কাণ্ডের ভেতর থেকে ডিগটি কেটে দেওয়ায় এই অবস্থা হয়।

আমন ধানের জমিতে এখন সবচেয়ে বেশি যে অভিযোগটা আসে, সেটা হলো — গাছের মাঝখানের ডিগটা শুকিয়ে গেছে, টান দিলে আস্ত উঠে আসছে। এটাই মাজরা পোকার কাজ। তবে গোটা পোকাটা দায়ী নয়। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের কীটতত্ত্ব বিভাগ পরিষ্কার করে লিখেছে, মাজরা পোকা শুধু কীড়া অবস্থায় গাছের ক্ষতি করতে পারে — উড়ন্ত মথটি নয়। এই একটা তথ্য জানা থাকলেই বছরে কয়েকটা অপ্রয়োজনীয় স্প্রে কমে যায়।

মাজরা পোকা আসলে কোন অবস্থায় ক্ষতি করে

ডিম থেকে সদ্য ফোটা কীড়াগুলো প্রথম দু’চার দিন গাছের খোলপাতার ভেতরে খায়। তারপর খেতে খেতে কাণ্ডের ভেতরে ঢুকে যায়, আর খাওয়ার এক পর্যায়ে গাছের মাঝখানের ডিগটা কেটে ফেলে। ভেতরে ঢুকে পড়ার পর স্প্রে করে আর তাকে ছোঁয়া যায় না — কীটনাশক কাণ্ডের বাইরে থেকে যায়, কীড়া ভেতরে বসে খেতে থাকে। সময়টাই তাই সবকিছু।

এ কারণেই ব্রি’র বিজ্ঞপ্তিগুলোতে মথ আর ডিমের গাদার কথা বারবার আসে। মথ মারলে বা ডিম নষ্ট করলে কীড়া জন্মানোর আগেই হিসাব চুকে যায়। কীড়া কাণ্ডে ঢুকে গেলে আর কিছু করার থাকে না।

মরা ডিগ আর মরা শীষ — কোনটা কখন দেখবেন

একই পোকা, কিন্তু গাছের বয়স অনুযায়ী ক্ষতির চেহারা দু’রকম, আর নাম দু’টি।

মরা ডিগ — গাছে শীষ বা ছড়া আসার আগে কীড়া ডিগ কেটে দিলে ডিগটা মারা যায়। ব্রি বলছে, এমন গাছে আর ধানের শীষই বের হয় না। মাঠে দাঁড়িয়ে দেখলে মাঝের পাতাটা শুকনো, বাদামি, আর ধরে টানলে সহজে উঠে আসে।

মরা শীষ — গাছে থোড় হওয়ার পর বা শীষ আসার সময় কীড়া ডিগ কেটে দিলে শীষটা মারা যায়। তখন শীষের ধানগুলো চিটা হয়ে যায় আর গোটা শীষ সাদা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সবুজ জমিতে খাড়া সাদা শীষ দূর থেকেই চোখে পড়ে।

মিলিয়ে দেখুন

সাদা শীষ দেখলেই মাজরা পোকা ধরে নেবেন না। শীষ ধরে আলতো টান দিন — মাজরার ক্ষতি হলে শীষটি গোড়া থেকে সহজে উঠে আসে এবং কাণ্ডের ভেতরটা ফাঁপা ও কাটা দেখাবে। গান্ধি পোকার চোষায় ধান চিটা হলে শীষ টানে ওঠে না।

কখন ব্যবস্থা নেবেন: ব্রি’র ক্ষতির মাত্রা

এটাই লেখাটির সবচেয়ে জরুরি অংশ, আর এখানেই সবচেয়ে বেশি ভুল হয়। দু’একটা মরা ডিগ দেখলেই স্প্রে করার দরকার নেই। ব্রি’র কীটতত্ত্ব বিভাগ যে সীমা দিয়েছে:

  • প্রতি বর্গমিটারে ২-৩টি স্ত্রী মথ বা ডিমের গাদা পাওয়া গেলে; অথবা
  • রোপণের ৪০ দিন পর থেকে থোড় আসা পর্যন্ত ১০-১৫% মরা ডিগ; অথবা
  • ৫% মরা শীষ দেখা গেলে

এর নিচে থাকলে কীটনাশক লাগে না — নিচের কাজগুলোই যথেষ্ট। শতাংশটা আন্দাজে না ধরে গুনে নিন: জমির কয়েক জায়গায় ১০০টি করে গোছা দেখে তার মধ্যে কয়টা মরা ডিগ, সেটাই আপনার শতকরা হিসাব। এখন খরিফ-২ চলছে, আর এই মৌসুমে আমনের ইউরিয়ার কিস্তি ও অন্যান্য কাজের সময়সূচি একই সপ্তাহে এসে পড়ে — মাজরার হিসাবটা তার সঙ্গেই সেরে ফেলুন।

কীটনাশক ছাড়া যে চারটি কাজ আগে করবেন

ব্রি’র রোপা আমন বিজ্ঞপ্তিতে কীটনাশকের তালিকা আসার আগে এই চারটি কাজের কথা বলা আছে, এবং এই ক্রমটা ইচ্ছাকৃত।

  • ডিমের গাদা সংগ্রহ করে নষ্ট করে ফেলুন। পাতার আগার দিকে বাদামি লোমে ঢাকা গাদাগুলো হাতে তুলে নিয়ে পুঁতে ফেলুন বা পুড়িয়ে দিন।
  • ক্ষেতে ডাল-পালা পুঁতে দিন। পোকা-খেকো পাখি তাতে বসে, আর পোকার সংখ্যা কমে। একে বলে পার্চিং। খরচ শূন্য।
  • সন্ধ্যার সময় আলোক ফাঁদ পাতুন। মথ আলোয় আকৃষ্ট হয়ে আসে, ধরে মেরে ফেলুন। ডিম পাড়ার আগে একটি স্ত্রী মথ মারা মানে গোটা একটি গাদা ঠেকানো।
  • ধান কাটার পর নাড়া পুড়িয়ে বা চাষ দিয়ে ফেলুন। নাড়ার গোড়ায় কীড়া ও পুত্তলি থেকে যায়, আর পরের মৌসুমের আক্রমণ সেখান থেকেই শুরু হয়।

এগুলো পুরনো ধাঁচের শোনালেও ব্রি এগুলোকেই প্রথমে রেখেছে, কারণ এতে খরচ নেই এবং উপকারী পোকা মরে না।

মাত্রা ছাড়ালে কোন কীটনাশক, কত মাত্রায়

উপরের সীমা পেরোলে ব্রি অনুমোদিত কীটনাশকের একটি তালিকা দিয়েছে, মাত্রা হেক্টর হিসাবে। বাংলাদেশে বেশির ভাগ কৃষক বিঘায় হিসাব করেন, তাই পাশে বিঘার কলাম যোগ করা হয়েছে — সেটি ১ বিঘা = ৩৩ শতক ধরে হিসাব করা, যা সরকারি রেকর্ডের মাপ। আপনার এলাকার বিঘা এর চেয়ে ছোট বা বড় হলে সংখ্যাটাও বদলাবে; জমির একক বদলে নেওয়ার হিসাব ঘরে নিজের মাপটা বসিয়ে দেখে নিন।

জেনেরিক নামব্র্যান্ড নামমাত্রা / হেক্টরমাত্রা / বিঘা
থায়ামেথোক্সাম + ক্লোরানট্রানিলিপ্রোলভির্তাকো ৪০ ডব্লিউজি75 গ্রাম10 গ্রাম
ক্লোরপাইরিফসডার্সবান ২০ ইসি1.0 লিটার134 মিলি
কার্বোসালফানমার্শাল ২০ ইসি1.5 লিটার200 মিলি
কার্টাপসানটাপ ৫০ এসপি1.4 কেজি187 গ্রাম
ফ্লুবেনডিয়ামাইডবেল্ট ২৪ ডব্লিউজি200 গ্রাম27 গ্রাম
ব্রি কীটতত্ত্ব বিভাগের ১২.০৯.২০২১ তারিখের রোপা আমন বিজ্ঞপ্তির তালিকা। হেক্টরের সংখ্যাগুলো ব্রি’র; বিঘার কলামটি ১ বিঘা = ৩৩ শতক ধরে হিসাব করা।

ব্যবহারবিধি

মাত্রা — উপরের তালিকার যেকোনো একটি কীটনাশক, একবারে। বিঘার হিসাবে: ভির্তাকো ৪০ ডব্লিউজি 10 গ্রাম, ডার্সবান ২০ ইসি 134 মিলি, মার্শাল ২০ ইসি 200 মিলি, সানটাপ ৫০ এসপি 187 গ্রাম, অথবা বেল্ট ২৪ ডব্লিউজি 27 গ্রাম। মেপে নিন — ঢাকনা বা মুঠোর আন্দাজে নয়। মিশ্রণে পরিষ্কার পানি ব্যবহার করুন, কাদা পানি নজল আটকে দেয়।

নিরাপদ ব্যবধান — ধান কাটার সম্ভাব্য তারিখ থেকে প্যাকেটে ছাপা PHI-এর দিনগুলো পিছিয়ে গুনুন; যে তারিখটি পাবেন, সেটিই শেষ স্প্রের শেষ দিন — তার পরে আর নয়। ব্রি’র এই দুই বিজ্ঞপ্তির কোনোটিতেই মাজরা পোকার কীটনাশকের PHI ছাপা নেই, তাই সংখ্যাটি প্যাকেটের গায়ে বা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে নিন। অনুমান করবেন না।

সুরক্ষা সরঞ্জাম — এপ্রোন, গামবুট, মুখোশ, চশমা, হ্যান্ডগ্লাভস ও ক্যাপ। এগুলো না পেলে গামছা, ফুলহাতা শার্ট আর পায়জামাও চলে। স্প্রে সকালে বা বিকেলে, বাতাসের বিপরীতে কখনও নয়। ছিটানোর পর জমিতে লাল নিশান পুঁতে দিন যাতে মানুষ, গরু, ছাগল বা হাঁস-মুরগি ক্ষেতে ঢুকে না পড়ে। খালি প্যাকেট সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে পুঁতে ফেলুন, আর স্প্রে মেশিন পুকুর বা নালায় ধোবেন না।

সূত্র: ব্রি কীটতত্ত্ব বিভাগ, রোপা আমন বিজ্ঞপ্তি ১২.০৯.২০২১ (মাত্রা) ও কৃষি তথ্য সার্ভিস, নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবহার (সুরক্ষা ও PHI-এর নিয়ম) — দুটোই দেখা হয়েছে ১৫ আগস্ট ২০২৬।

একই গ্রুপের কীটনাশক প্রতি মৌসুমে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ব্যবহার না করে ভিন্ন গ্রুপে যাওয়ার পরামর্শ ব্রি নিজেই দিয়েছে — একই গ্রুপ বারবার দিলে পোকা সয়ে যায়।

ধানে যেসব গ্রুপ ব্যবহার করবেন না

এই অংশটা তালিকার চেয়েও জরুরি। ব্রি’র কীটতত্ত্ব বিভাগের প্রধান ড. শেখ শামিউল হকের স্বাক্ষর করা বিজ্ঞপ্তিতে সরাসরি লেখা আছে, ধানের পোকা দমনে এই গ্রুপগুলোর কীটনাশক ব্যবহার করা যাবে না: সাইপারমেথ্রিন, আলফা-সাইপারমেথ্রিন, ল্যাম্বডা-সাইহ্যালোথ্রিন, ডেলটামেথ্রিন ও ফেনভালারেট।

কারণটা উল্টো দিকের। এগুলো পোকা মারে ঠিকই, কিন্তু উপকারী পোকাও মেরে ফেলে, ফলে কিছুদিন পর আক্রমণ আগের চেয়ে বেড়ে যায় — একে বলে রিসার্জেন্স। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, ক্লোরপাইরিফসের সঙ্গে এসব গ্রুপ মেশানো মিশ্রণও ধানে চলবে না; নাম ধরে যেগুলো বাদ দিতে বলা হয়েছে তার মধ্যে আছে ক্যারাটে, নাইট্রো, কারফু, সাবসাইড, মিক্সার, ডেয়ার, এটম, কেনভস, সুপারফাস্ট, বর্ডার, দুর্বার ও আলটিমা।

যা করবেন না

দোকানে গিয়ে “ধানের পোকার ওষুধ” চেয়ে যা দেওয়া হয় তা-ই নিয়ে আসবেন না। উপরের নামগুলোর কোনোটি হলে সেটি ধানের জন্য নয় — প্যাকেটের গায়ে জেনেরিক নাম দেখে মিলিয়ে নিন, এবং কোনটি অনুমোদিত তা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অনুমোদিত বালাইনাশক তালিকা থেকে যাচাই করে নিন।

মাজরা পোকার পুরো বিজ্ঞপ্তিগুলো ব্রি’র ধানের পোকামাকড় দমন ব্যবস্থাপনার পাতায় পিডিএফ আকারে আছে, আর স্প্রে করার নিরাপত্তার নিয়মগুলো বিস্তারিত পাবেন কৃষি তথ্য সার্ভিসের নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবহার পাতায়। ধানের অন্য পোকা ও রোগ চিনতে রোগ ও পোকার লেখাগুলোও কাজে লাগবে।

সূত্র

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, কীটতত্ত্ব বিভাগ — “রোপা আমন মওসুমে ধানে মাজরা পোকার আক্রমণ ও করণীয়”, ১২.০৯.২০২১ — দেখা হয়েছে ২০২৬-০৮-১৫
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, কীটতত্ত্ব বিভাগ — “মাজরা পোকা দমনে করণীয়”, ড. শেখ শামিউল হক, সিএসও ও বিভাগীয় প্রধান — দেখা হয়েছে ২০২৬-০৮-১৫
কৃষি তথ্য সার্ভিস — “নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবহার”, সর্বশেষ হালনাগাদ ২৭ জুন ২০১৫ — দেখা হয়েছে ২০২৬-০৮-১৫
এই লেখায় ভুল পেয়েছেন? জানান — [email protected] সংশোধন হলে কী বদলেছে ও কোন তারিখে, তা লেখার নিচে লিখে রাখা হয়।
যাচাই করেছেন
কৃষিবিদ জাকারিয়া হোসেন
কৃষিবিদ · ডিসকভারি এগ্রোটেক · যাচাই ৩১শে শ্রাবণ ১৪৩৩

বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি কাজের অভিজ্ঞতা; খরিফ-১, খরিফ-২ ও রবি — তিন মৌসুম জুড়েই নতুন কৃষি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন।

Scroll to Top