লাউ বা করলার গায়ে ছোট্ট একটা ছিদ্র, তার চারপাশে শুকনো বাদামি দাগ — বাজারে নেওয়ার আগেই ফলটা ভেতর থেকে নষ্ট। কুমড়াজাতীয় সবজিতে এটাই ফলের মাছি পোকার স্বাক্ষর। কৃষি তথ্য সার্ভিসের হিসাবে কুমড়াজাতীয় ফসল ও আমে এই পোকা বছরে প্রায় ৬৮ কোটি টাকার সমপরিমাণ ক্ষতি করে।
ফলের মাছি পোকা কীভাবে ফল নষ্ট করে
স্ত্রী মাছি কচি ফলের নিচের দিকে ওভিপজিটর ঢুকিয়ে ডিম পাড়ে। ডিম পাড়ার জায়গা থেকে পানির মতো তরল পদার্থ বেরিয়ে আসে, যা শুকিয়ে বাদামি রং ধারণ করে। ডিম থেকে কীড়া বের হয়ে ফলের শাঁস খেতে শুরু করে, আর ফল হলুদ হয়ে পচে ঝরে যায়।
তাই ফল কাটার পর ভেতরে পোকা দেখে চেনা নয় — বাইরের ওই শুকনো বাদামি ফোঁটাটাই আগাম চিহ্ন। লাউ, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া, কাঁকরোল, করলা, চিচিঙ্গা ও ধুন্দুল — সব লতাজাতীয় সবজিতেই এই পোকা বেশি আক্রমণ করে।
মিলিয়ে দেখুন
সন্দেহ হলে ঝরে পড়া ফলটি কেটে দেখুন — ভেতরে সাদা কীড়া থাকলে নিশ্চিত। ফলটি তখন জমিতে ফেলে রাখবেন না; ওটাই পরের প্রজন্মের আঁতুড়ঘর।
প্রথম কাজ: আক্রান্ত ফল সংগ্রহ ও ধ্বংস
সবচেয়ে সস্তা ধাপটি বেশির ভাগ ক্ষেতে বাদ পড়ে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের করলা চাষের নির্দেশনায় প্রথমেই বলা হয়েছে — আক্রান্ত ফল বা ফুল সংগ্রহ করে ধ্বংস করতে হবে।
ঝরে পড়া ও আক্রান্ত ফল জমিতে বা আইলে জমতে দিলে ভেতরের কীড়া মাটিতে গিয়ে পুত্তলি হয় এবং পরের ঝাঁক বের হয়। মাটিতে পুঁতে ফেলাই নিরাপদ।
ফেরোমন ফাঁদ: প্রথম ফুল আসামাত্র
কুমড়াজাতীয় ফসলে ফাঁদ বসানোর সময় ফুল ধরার সঙ্গে বাঁধা — নির্দেশনায় বলা হয়েছে প্রথম ফুল আসামাত্র ফেরোমন ফাঁদ স্থাপন করতে হবে, প্রতি 10 শতাংশের জন্য 3টি হারে।
ফুল আসার আগে ফাঁদ বসিয়ে লাভ নেই, আর ফল ধরার পরে বসালে দেরি হয়ে যায়। ফাঁদের গড়ন, সাবান পানির স্তর আর লিউর কত দিনে বদলাতে হয় — ফেরোমন ফাঁদ বানানো ও রক্ষণাবেক্ষণের মাপগুলো আলাদা করে দেওয়া আছে।
বিষটোপ তৈরির পদ্ধতি
ফাঁদ পুরুষ মাছি ধরে; বিষটোপ ধরে স্ত্রী মাছিকেও, কারণ ডিম পাড়ার আগে স্ত্রী মাছির খাবার দরকার হয়। কৃষি তথ্য সার্ভিসের দেওয়া অনুপাত:
| উপকরণ | পরিমাণ |
|---|---|
| পাকা মিষ্টি কুমড়া বা কুমড়াজাতীয় ফল, কুচি কুচি করে কাটা | 100 গ্রাম |
| সামান্য বিষ (যেমন সপসিন) | 0.25 গ্রাম |
মিশ্রণটি মাটির পাত্রে করে ক্ষেতের মাঝে মাঝে স্থাপন করতে হবে। মাটির পাত্র বলার কারণ আছে — রোদে প্লাস্টিক গরম হয়ে টোপ শুকিয়ে যায়, আর মাটির পাত্র ভেতরটা ঠান্ডা রাখে।
ব্যবহারবিধি
মাত্রা — বিষটোপে 100 গ্রাম পাকা কুমড়ার কুচির সঙ্গে 0.25 গ্রাম বিষ — এর বেশি নয়। মাপ ছাড়া “একটু বেশি” দিলে টোপ থেকে গন্ধ বদলে যায় এবং মাছি বসে না, আর অবশিষ্টাংশের ঝুঁকি বাড়ে। বিষটোপ ফল বা গাছে নয়, আলাদা মাটির পাত্রে থাকবে।
নিরাপদ ব্যবধান — বিষটোপ ফসলের গায়ে লাগে না, তবু পাত্র সরানোর তারিখ আগে থেকে ঠিক করুন এবং প্যাকেটে ছাপা PHI-এর দিন সবজি তোলার সম্ভাব্য তারিখ থেকে পিছিয়ে গুনে নিন। কৃষি তথ্য সার্ভিসের এই নির্দেশনায় সপসিনের PHI ছাপা নেই — সংখ্যাটি প্যাকেট থেকে বা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে নিন, অনুমান নয়।
সুরক্ষা সরঞ্জাম — এপ্রোন, গামবুট, মুখোশ, চশমা, হ্যান্ডগ্লাভস ও ক্যাপ; না পেলে গামছা, ফুলহাতা শার্ট আর পায়জামা। বিষ মেশানোর সময় খালি হাতে নয়। বিষটোপের পাত্র শিশু, হাঁস-মুরগি ও গৃহপালিত পশুর নাগালের বাইরে রাখুন।
সূত্র: কৃষি তথ্য সার্ভিস, করলা চাষের নির্দেশনা ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (বিষটোপের অনুপাত) ও নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবহার (সুরক্ষা) — দুটোই দেখা হয়েছে ১৫ আগস্ট ২০২৬
কেন ঢালাও স্প্রে এখানে কাজ করে না
কুমড়াজাতীয় সবজি ফল ধরে পরাগায়নের পর, আর পরাগায়ন করে পোকা। ফুল ধরার সময় গোটা ক্ষেতে ঢালাও স্প্রে করলে মাছির সঙ্গে সেই উপকারী পোকাগুলোও মরে, ফলে মাছি কমলেও ফল ধরা কমে যায়।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরিবেশবান্ধব দমন-পদ্ধতির নিবন্ধে আকর্ষণ ও দমন পদ্ধতির সুবিধা হিসেবে ঠিক এটাই বলা হয়েছে — এতে মাছি পোকা ছাড়া অন্য উপকারী ও অপকারী পোকা মারা যায় না। মাঠ পরীক্ষায় এই পদ্ধতিতে ৯৭% পর্যন্ত মাছি দমন পাওয়া গেছে, আর দিনাজপুরের বিরল ও বীরগঞ্জের করলাচাষিদের নিয়ে করা পরীক্ষায় একই ফল এসেছে।
তিনটি কাজ একসঙ্গে করলে তবেই হিসাব মেলে — ঝরা ফল তুলে ফেলা, ফুল আসার দিনেই ফাঁদ, আর মাটির পাত্রে বিষটোপ। একটি বাদ দিলে বাকি দুটোর ফলও কমে যায়। একই নীতিতে বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার জন্য ফাঁদ, ডিম ও কীড়া — তিন পর্যায়ে আলাদা ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
