মাঠে দাঁড়িয়ে দেখলে মনে হবে ধানক্ষেতের একটা গোল অংশ পুড়ে গেছে। আগুন লাগেনি। ওটা বাদামি গাছফড়িংয়ের কাজ, আর স্থানীয়ভাবে অনেকে একে কারেন্ট পোকা বলেন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের কীটতত্ত্ব বিভাগের বিজ্ঞপ্তিতে একটি বাক্য আছে যেটি এই পোকার গোটা গল্প বলে দেয় — কৃষক এই পোকার আক্রমণ সনাক্ত করার আগেই এটি অতি দ্রুত মাঠের সম্পূর্ণ ফসল নষ্ট করে ফেলে।
বাদামি গাছফড়িং দেখতে কেমন, কোথায় বসে
বাচ্চা ও পূর্ণবয়স্ক — দুই অবস্থাতেই এই পোকা ধানগাছের গোড়ায় বসে রস শুষে খায়। এটাই সবচেয়ে জরুরি তথ্য, কারণ এখান থেকেই স্প্রে কোথায় করতে হবে সেই সিদ্ধান্ত আসে।
পোকা খুঁজতে হলে গাছের ঝাড় দুই হাতে ফাঁক করে গোড়ার দিকে তাকাতে হয়, পাতার উপর নয়। একসঙ্গে অনেকগুলো পোকা রস শুষে খাওয়ার ফলে গাছ প্রথমে হলদে ও পরে শুকিয়ে মারা যায়।
মিলিয়ে দেখুন
ধানের গোড়ায় হাত দিয়ে ঝাড় ফাঁক করুন এবং পানির উপরিভাগ দেখুন — পোকা নড়াচড়া করলে চোখে পড়বে। পাতা হলুদ হলেই গাছফড়িং ধরে নেবেন না — সারের ঘাটতি, জলাবদ্ধতা বা অন্য রোগেও পাতা হলুদ হয়। গোড়ায় পোকা না পেলে কারণটা অন্য কোথাও।
হপার বার্ণ — যে লক্ষণে দেরি হয়ে যায়
অনেক পোকা একসঙ্গে রস শুষলে গাছ শুকিয়ে যায় এবং দূর থেকে পুড়ে যাওয়ার মতো দেখায়। ব্রি এই ধরনের ক্ষতিকে হপার বার্ণ বা ফড়িং পোড়া বলছে।
সমস্যা হলো, হপার বার্ণ দেখা যাওয়া মানে ক্ষতি ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে। তখন আর ফেরানো যায় না। বিজ্ঞপ্তিতে সরাসরি লেখা — ধানের শীষ আসার সময় বা তার আগে হপার বার্ণ হলে কোনো ফলনই পাওয়া যায় না। তাই পোড়া দাগ দেখে ব্যবস্থা নেওয়া নয়, তার আগেই গোড়ায় পোকা গুনতে হবে।
জলাবদ্ধ এলাকায় অনুকূল পরিবেশ থাকায় আমন ধানে এই পোকার প্রাথমিক বংশবিস্তার হয়, যা পরে আশেপাশের ধানক্ষেতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেশীর জমিতে হপার বার্ণ দেখলে নিজের জমি সেদিনই দেখুন।
ব্রি’র ক্ষতির মাত্রা
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী কীটনাশক তখনই, যখন পোকার আক্রমণ অর্থনৈতিক ক্ষতির দ্বার প্রান্তে পৌঁছেছে — চারটি ডিমওয়ালা পেট মোটা পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী পোকা, অথবা ১০টি বাচ্চা বাদামি গাছফড়িং, অথবা উভয়ই। সংখ্যাগুলো ব্রি’র ধানের পোকামাকড় দমন ব্যবস্থাপনার পাতার বিজ্ঞপ্তি থেকে নেওয়া।
গোনার একক নিশ্চিত করে নিন
এই বিজ্ঞপ্তিতে সংখ্যাগুলো কীসের হিসাবে — প্রতি গোছা না প্রতি বর্গমিটার — তা ছাপা নেই। গোনার আগে নিকটস্থ উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে এককটি জেনে নিন। ভুল এককে গুনলে হয় অপ্রয়োজনে স্প্রে হবে, নয়তো দেরি হয়ে যাবে।
পানি সরানো ও ইউরিয়া — দুই সিদ্ধান্তেই অর্ধেক কাজ
ব্রি’র তালিকায় কীটনাশকের আগে তিনটি কাজ:
- আলোক ফাঁদ ব্যবহার করুন।
- জমিতে পোকা বাড়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে জমে থাকা পানি সরিয়ে ফেলুন। জলাবদ্ধতাই এদের বংশবিস্তারের পরিবেশ তৈরি করে।
- উর্বর জমিতে ইউরিয়া সারের উপরি প্রয়োগ করবেন না।
পানি সরানোর কাজটি বিনা খরচে করা যায় এবং এটি একই সঙ্গে খোলপোড়া রোগের প্রকোপও কমায়, কারণ সেটিও জলাবদ্ধ জমিতে বেশি হয়।
অনুমোদিত কীটনাশক, মাত্রা ও প্রয়োগের জায়গা
ব্রি’র তালিকা হেক্টর হিসাবে; বিঘার কলামটি ১ বিঘা = ৩৩ শতক ধরে হিসাব করা। জমির একক নিজের মাপে বদলে নেওয়ার ঘরটি পাশে খুলে রাখলে সুবিধা হয়।
| জেনেরিক নাম | ব্র্যান্ড নাম | মাত্রা / হেক্টর | মাত্রা / বিঘা |
|---|---|---|---|
| পাইমেট্রোজিন | প্লিনাম ৫০ ডব্লিউজি | 500 গ্রাম | 67 গ্রাম |
| থায়ামেথোক্সাম | একতারা ২৫ ডব্লিউজি | 60 গ্রাম | 8 গ্রাম |
| এমআইপিসি | মিপসিন ৭৫ ডব্লিউপি | 1.3 কেজি | 174 গ্রাম |
| ইমিডাক্লোপ্রিড | এডমায়ার ২০ এসএল | 125 এমএল | 17 মিলি |
| অ্যাবামেকটিন | সানমেক্টিন ১.৮ ইসি | 1.0 লিটার | 134 মিলি |
| অ্যাসিফেট | এসাটাফ ৭৫ এসপি | 750 গ্রাম | 100 গ্রাম |
| অ্যাসিটামিপ্রিড | প্লাটিনাম ২০ এসপি | 50 গ্রাম | 7 গ্রাম |
| কার্বোসালফান | মার্শাল ২০ ইসি | 1.0 লিটার | 134 মিলি |
ব্যবহারবিধি
মাত্রা — তালিকার যেকোনো একটি, একবারে। কীটনাশক অবশ্যই গাছের গোড়ায় প্রয়োগ করতে হবে — পোকা সেখানেই বসে, তাই পাতার উপর স্প্রে করলে ওষুধ নষ্ট হয় আর পোকা বেঁচে যায়। নজল নিচে নামিয়ে ঝাড়ের গোড়া ভিজিয়ে দিন।
নিরাপদ ব্যবধান — ধান কাটার সম্ভাব্য তারিখ থেকে প্যাকেটে ছাপা PHI-এর দিনগুলো পিছিয়ে গুনুন — যে তারিখ পাবেন, সেটিই শেষ প্রয়োগের শেষ দিন। ব্রি’র এই বিজ্ঞপ্তিতে PHI ছাপা নেই, তাই সংখ্যাটি প্যাকেট থেকে বা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে নিন। অনুমান করবেন না।
সুরক্ষা সরঞ্জাম — এপ্রোন, গামবুট, মুখোশ, চশমা, হ্যান্ডগ্লাভস ও ক্যাপ; না পেলে গামছা, ফুলহাতা শার্ট আর পায়জামা। স্প্রে সকালে বা বিকেলে, বাতাসের বিপরীতে নয়। ছিটানোর পর জমিতে লাল নিশান পুঁতে দিন যাতে মানুষ ও গরু-ছাগল ঢুকে না পড়ে। খালি প্যাকেট মাটিতে পুঁতে ফেলুন; স্প্রে মেশিন পুকুর বা নালায় ধোবেন না। পুরো নিরাপত্তা-নির্দেশিকা কৃষি তথ্য সার্ভিসের পাতায় পড়ে নিন।
সূত্র: ব্রি কীটতত্ত্ব বিভাগ, ধানের বাদামি গাছফড়িং দমনে করণীয় (মাত্রা ও প্রয়োগস্থল) ও কৃষি তথ্য সার্ভিস, নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবহার — দেখা হয়েছে ১৫ আগস্ট ২০২৬ (সুরক্ষা)
যা করবেন না
ধানের পোকা দমনে সাইপারমেথ্রিন, আলফা-সাইপারমেথ্রিন, ল্যাম্বডা-সাইহ্যালোথ্রিন, ডেলটামেথ্রিন ও ফেনভালারেট গ্রুপের কীটনাশক ব্রি নিষেধ করেছে — এসব ব্যবহারে পোকার রিসার্জেন্স ঘটে, অর্থাৎ কিছুদিন পর আক্রমণ আগের চেয়ে বেড়ে যায়। ক্লোরপাইরিফসের সঙ্গে এসব গ্রুপ মেশানো মিশ্রণও ধানে চলবে না; নাম ধরে বাদ দিতে বলা হয়েছে ক্যারাটে, নাইট্রো, কারফু, সাবসাইড, মিক্সার, ডেয়ার, এটম, কেনভস, সুপারফাস্ট, বর্ডার, দুর্বার ও আলটিমা। দোকানে “ধানের পোকার ওষুধ” চেয়ে যা দেওয়া হয় তা-ই নেবেন না — প্যাকেটের জেনেরিক নাম মিলিয়ে নিন।
এই পোকার ক্ষেত্রে দেরিটাই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। সপ্তাহে একবার ঝাড় ফাঁক করে গোড়ায় তাকানো — এটুকুই হপার বার্ণ আর স্বাভাবিক ফলনের মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেয়।
