ডিসকভারি এগ্রোটেক
রোগ ও পোকা

ধানের খোলপোড়া রোগের লক্ষণ ও বর্ষায় প্রতিকার

ধানের খোলপোড়া রোগে গাছের গোড়ার দিকে পাতার খোলে পানি-ভেজা দাগ পড়ে, দাগ বড় হয়ে মিশে গিয়ে গোখরা সাপের চামড়ার মতো দেখায়। ব্রি বলছে, আক্রমণ গাছের উচ্চতার ৩০ ভাগের নিচে থাকলে ছত্রাকনাশক লাগে না — সুষম সার, পটাশ ও AWD সেচেই বড় অংশ ঠেকানো যায়।

ধানগাছের গোড়ার দিকে পাতার খোলে ডিম্বাকার দাগ, মাঝখানে ছাই রং ও চারপাশে বাদামি সীমারেখা; কয়েকটি দাগ মিশে সাপের চামড়ার নকশা তৈরি করেছে।
পাতার খোলে ছাই রঙের দাগ, চারপাশে বাদামি রেখা — কয়েকটি দাগ মিশে গোখরা সাপের চামড়ার মতো দেখাচ্ছে।

খোলপোড়া রোগ আউশ ও আমন মৌসুমে ধানের অন্যতম প্রধান রোগ। বর্ষার ভ্যাপসা আবহাওয়াই এর সবচেয়ে বড় বন্ধু। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের ভাষায়, সঠিক সময়ে ব্যবস্থা না নিলে এ রোগ ধানের ফলনের ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে। ভালো খবর হলো, এর প্রতিকারের বড় অংশটাই ছত্রাকনাশক নয় — সার আর সেচের সিদ্ধান্ত।

খোলপোড়া রোগ কীভাবে চেনা যায়

প্রাথমিক অবস্থায় ধানগাছের গোড়ার দিকে পাতার খোলে পানি-ভেজা দাগ পড়ে। দাগগুলো আকারে বড় হয়ে একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়। দাগের মাঝখানে সাদা বা ছাই রঙ হয়, আর বাদামি রেখা দিয়ে চারপাশ সীমাবদ্ধ থাকে।

অনেকগুলো দাগ পাশাপাশি থাকলে দেখতে গোখরা সাপের চামড়ার মতো লাগে — এটাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য চিহ্ন। রোগটি গাছের পাতাতেও একই রকম লক্ষণ সৃষ্টি করে।

মিলিয়ে দেখুন

দাগ খুঁজতে হবে পানির সীমানার কাছাকাছি, পাতার খোলে — উপরের পাতায় নয়। খোলটা আলতো করে ফাঁক করে দেখুন। দাগের বাদামি সীমারেখা আর ভেতরের ছাই রং একসঙ্গে থাকলে খোলপোড়া ধরে নেওয়া যায়।

কোন অবস্থায় রোগ বাড়ে

ব্রি তিনটি কারণ আলাদা করে চিহ্নিত করেছে, আর তিনটিই কৃষকের হাতে।

  • ভ্যাপসা আবহাওয়া — বেশি তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা একসঙ্গে হলে প্রকোপ বাড়ে।
  • বেশি ইউরিয়া — অতিরিক্ত ইউরিয়া সার ব্যবহার করলে রোগের তীব্রতা বাড়ে।
  • জলাবদ্ধ জমি — পানি জমে থাকা জমিতে খোলপোড়ার প্রাদুর্ভাব বেশি হয়।

আবহাওয়া বদলানো যায় না। বাকি দুটো যায়, আর সেখানেই গোটা লড়াইটা — কারণ ইউরিয়ার কিস্তি আর জমির পানি, দুটোই সিদ্ধান্তের বিষয়, ভাগ্যের নয়। অতিরিক্ত ইউরিয়া পাতা মোড়ানো পোকাকেও ডেকে আনে, তাই একই সংযম দুই সমস্যাতেই কাজে দেয়।

সার ও সেচ দিয়েই বড় অংশ ঠেকানো যায়

ব্রি’র “রোগ দমনে করণীয়” তালিকার প্রথম কাজগুলো একটাও স্প্রে নয়।

  • সুষম সার, বিশেষত ইউরিয়া সঠিক মাত্রায় কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে।
  • পটাশ সার সমান দুই কিস্তিতে — এক ভাগ জমি তৈরির শেষ চাষে, আর অন্য ভাগ শেষ কিস্তি ইউরিয়ার সঙ্গে মিশিয়ে।
  • পর্যায়ক্রমে ভেজানো ও শুকানো (AWD) সেচ ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করতে হবে।
  • দূরত্ব বাড়িয়ে রোপণ রোগপ্রবণ এলাকায় ও সংবেদনশীল জাতে — সারি থেকে সারি এবং চারা থেকে চারা ২৫×১৫ সেমি, ২০×২০ সেমি বা ২৫×২০ সেমি।
  • ভাসমান আবর্জনা ধ্বংস — শেষ চাষের সময় জমিতে ভাসা আবর্জনা সংগ্রহ করে নষ্ট করতে হবে।

দূরত্ব বাড়ানোর কথাটা অনেকের কাছে ফলন কমানোর মতো শোনায়। কিন্তু ঘন রোপণে গাছের মাঝে বাতাস চলে না, আর্দ্রতা জমে থাকে, আর ছত্রাক ঠিক সেটাই চায়। সারের কিস্তি ও জমির মাপ বিঘা হিসাবে মিলিয়ে নেওয়ার ঘরে নিজের জমির হিসাবটা বসিয়ে দেখুন।

কখন ছত্রাকনাশক লাগবে: ৩০% সীমা

ব্রি সরাসরি লিখেছে — রোগের আক্রমণ গাছের উচ্চতার শতকরা ৩০ ভাগের নিচে থাকলে ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করার প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ দাগ যদি গাছের নিচের দিকেই সীমাবদ্ধ থাকে, স্প্রে বাদ। সীমাটি ব্রি’র ধানের রোগ ও প্রতিকারের প্রকাশনায় দেওয়া।

মাপটা সহজ। গাছের গোড়া থেকে সবচেয়ে উপরের দাগ পর্যন্ত উচ্চতা, আর গোটা গাছের উচ্চতা — অনুপাতটাই হিসাব। দাগ যখন উপরের পাতার খোলে উঠতে শুরু করে, তখনই সিদ্ধান্তের সময়।

অনুমোদিত ছত্রাকনাশক ও বিঘাপ্রতি মাত্রা

এই তালিকার একটা সুবিধা আছে — ব্রি মাত্রাগুলো সরাসরি বিঘা হিসাবে দিয়েছে, তাই হেক্টর থেকে ভাগ করে নেওয়ার ঝামেলা নেই।

ব্র্যান্ড নামমাত্রা / বিঘাপানি
ফলিকুর66 মিলি66 লিটার
নাটিভো33 গ্রাম66 লিটার
স্কোর66 মিলি66 লিটার
ব্রি উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগ, প্রকাশনা নম্বর ৩০৫, অক্টোবর ২০২১। মাত্রা ও পানির পরিমাণ দুটোই ব্রি’র দেওয়া, বিঘা হিসাবে।

ব্যবহারবিধি

মাত্রা — তালিকার যেকোনো একটি ছত্রাকনাশক — ফলিকুর 66 মিলি, নাটিভো 33 গ্রাম, অথবা স্কোর 66 মিলি — প্রতি বিঘার জন্য 66 লিটার পানিতে মিশিয়ে যথাযথভাবে প্রয়োগ করুন। পানির পরিমাণ কমালে মাত্রা ঘন হয়ে পাতা পুড়তে পারে; মেপে নিন।

নিরাপদ ব্যবধান — ধান কাটার সম্ভাব্য তারিখ থেকে প্যাকেটে ছাপা PHI-এর দিনগুলো পিছিয়ে গুনুন — যে তারিখ পাবেন, সেটিই শেষ প্রয়োগের শেষ দিন। ব্রি’র এই প্রকাশনায় PHI ছাপা নেই, তাই সংখ্যাটি প্যাকেট থেকে বা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে নিন। অনুমান করবেন না।

সুরক্ষা সরঞ্জাম — এপ্রোন, গামবুট, মুখোশ, চশমা, হ্যান্ডগ্লাভস ও ক্যাপ; না পেলে গামছা, ফুলহাতা শার্ট আর পায়জামা। স্প্রে সকালে বা বিকেলে, বাতাসের বিপরীতে নয়। ছিটানোর পর জমিতে লাল নিশান পুঁতে দিন যাতে মানুষ ও গরু-ছাগল ঢুকে না পড়ে। খালি প্যাকেট মাটিতে পুঁতে ফেলুন; স্প্রে মেশিন পুকুর বা নালায় ধোবেন না। সুরক্ষার এই তালিকা কৃষি তথ্য সার্ভিসের বালাইনাশক নির্দেশিকা থেকে নেওয়া।

সূত্র: ব্রি উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগ, প্রকাশনা ৩০৫, অক্টোবর ২০২১ (মাত্রা) ও কৃষি তথ্য সার্ভিস, নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবহার — দেখা হয়েছে ১৫ আগস্ট ২০২৬ (সুরক্ষা)

খোলপোড়ার বড় অংশটা ঠেকানো যায় স্প্রে ছাড়াই — পটাশ দুই কিস্তিতে, ইউরিয়া মেপে, আর জমিতে পানি জমতে না দিয়ে। ছত্রাকনাশক শেষ ধাপ, প্রথম নয়।

সূত্র

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগ — “ধানের খোলপোড়া রোগ দমনে কৃষকের করণীয়”, ব্রি প্রকাশনা নম্বর ৩০৫, প্রকাশকাল অক্টোবর ২০২১ — দেখা হয়েছে ২০২৬-০৮-১৫
কৃষি তথ্য সার্ভিস — “নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবহার”, সর্বশেষ হালনাগাদ ২৭ জুন ২০১৫ — দেখা হয়েছে ২০২৬-০৮-১৫
এই লেখায় ভুল পেয়েছেন? জানান — [email protected] সংশোধন হলে কী বদলেছে ও কোন তারিখে, তা লেখার নিচে লিখে রাখা হয়।
যাচাই করেছেন
কৃষিবিদ জাকারিয়া হোসেন
কৃষিবিদ · ডিসকভারি এগ্রোটেক · যাচাই ৩১শে শ্রাবণ ১৪৩৩

বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি কাজের অভিজ্ঞতা; খরিফ-১, খরিফ-২ ও রবি — তিন মৌসুম জুড়েই নতুন কৃষি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন।

Scroll to Top