ব্লাস্ট রোগের নাম বাংলাদেশের প্রায় সব ধানচাষি জানেন। কিন্তু কোন চেহারাটা মাঠে দেখছেন, সেটা প্রায়ই গুলিয়ে যায়। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট রোগটিকে তিন ভাগে ভাগ করেছে — পাতা ব্লাস্ট, গীট ব্লাস্ট ও নেক ব্লাস্ট। তিনটির লক্ষণ আলাদা, আর ভয়ের মাত্রাও আলাদা।
ব্লাস্ট রোগের তিন চেহারা
পাতা ব্লাস্ট। পাতায় ছোট ছোট ডিম্বাকৃতির সাদা বা বাদামি দাগ দেখা দেয়। পর্যায়ক্রমে সমস্ত পাতা ও ক্ষেতে ছড়িয়ে পড়ে। আক্রমণ বেশি হলে ক্ষেতের বিভিন্ন স্থানে রোদে পুড়ে যাওয়ার মতো দেখায়। আক্রান্ত ক্ষেতে অনেক সময় পাতা ও খোলের সংযোগস্থলে কালো দাগ দেখা দেয়, যা পরে পচে পাতা ভেঙে পড়ে ফলন নষ্ট করে।
গীট ব্লাস্ট। ধানের থোড় বা গর্ভবতী অবস্থায় এ রোগ হলে গিঁটে কালো দাগের সৃষ্টি হয়, আর ধানগাছ গিঁট থেকে খসে পড়ে।
নেক ব্লাস্ট। শীষ অবস্থায় এ রোগ হলে শীষের গোড়া কালো হয়ে যায়। আক্রমণ বেশি হলে শীষের গোড়া ভেঙে যায় এবং ধান চিটা হয়।
নেক ব্লাস্ট কেন সবচেয়ে ভয়ের
কারণ এটি ধরা পড়ে দেরিতে, আর ক্ষতি হয় সবচেয়ে বেশি। শীষের গোড়া কালো হয়ে ভেঙে গেলে দানা আর ভরে না — গোটা শীষটাই চিটা। মাঠে সবুজ ধানের মধ্যে খাড়া সাদা শীষ চোখে পড়ে, কিন্তু ততক্ষণে সেই শীষটির আর কিছু করার নেই।
মিলিয়ে দেখুন
খাড়া সাদা শীষ দেখলে গোড়াটা পরীক্ষা করুন। নেক ব্লাস্টে শীষের গোড়া কালো হবে; মাজরা পোকার মরা শীষে গোড়া কালো হয় না, বরং শীষটি টান দিলে সহজে উঠে আসে ও কাণ্ডের ভেতর কাটা থাকে। এই একটি পরীক্ষা দুটো সম্পূর্ণ আলাদা ব্যবস্থাপনার মধ্যে বেছে দেয়।
রোগ ঠেকানোর কাজগুলো আগে
ব্রি’র প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনার তালিকা:
- প্রথমত, রোগ প্রতিরোধী জাত চাষ করা।
- আক্রান্ত ক্ষেতের খড়কুটা আঙিনায় পুড়িয়ে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া।
- সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ — এর মাধ্যমেই ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধ করা যায়।
- ক্ষেতে পানি সংরক্ষণ করতে হবে।
প্রথমটি সস্তা, আর সবচেয়ে উপেক্ষিত। জাত বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বীজতলার সময়, রোগ দেখা দেওয়ার পর নয়। একই কারণে বাদামি গাছফড়িংয়ের জন্য জমির পানি ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্তও রোপণের সময়েই নিতে হয়।
ইউরিয়া বন্ধ, এমওপি চালু
এটি ব্লাস্ট ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বাস্তব পরামর্শ, আর অনেকে ঠিক উল্টোটা করেন। ব্রি লিখেছে — রোগের আক্রমণ হলে ইউরিয়া সারের উপরি প্রয়োগ বন্ধ করতে হবে।
তার বদলে বিঘা প্রতি 5–7 কেজি এমওপি সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে, অথবা 5 গ্রাম/লিটার হারে স্প্রে করা যেতে পারে। পরামর্শটি ব্রি’র ধানের রোগ ও প্রতিকারের তালিকা থেকে। গাছ দুর্বল দেখে ইউরিয়া ছিটালে রোগ আরও বাড়ে — নাইট্রোজেন পাতাকে নরম করে, আর ছত্রাক নরম পাতাতেই বসে।
অনুমোদিত ছত্রাকনাশক ও পানিপ্রতি মাত্রা
ব্লাস্টের মাত্রাগুলো ব্রি দিয়েছে প্রতি লিটার পানির হিসাবে, জমির মাপে নয় — তাই স্প্রে মেশিনের ট্যাঙ্ক কত লিটার, সেটাই আপনার হিসাবের ভিত্তি।
| জেনেরিক নাম | ব্র্যান্ড নাম | মাত্রা / লিটার পানি |
|---|---|---|
| ট্রাইসাইক্লাজোল | টুপার ৭৫ ডব্লিউপি | 0.75 গ্রাম |
| ট্রাইসাইক্লাজোল + প্রোপিকোনাজল | ফিলিয়া ৫২৫ এসই | 2 মিলি |
| থায়োপেনেট মিথাইল | টপসিন এম ৭০ ডব্লিউপি | 2 গ্রাম |
| টেবুকোনাজল + ট্রাইফ্লক্সিস্ট্রোবিন | নাটিভো | 0.50 গ্রাম |
| অ্যাজোক্সিস্ট্রোবিন + ডাইফেনোকোনাজল | এজকর / এমিস্টার টপ | 1 মিলি |
ব্যবহারবিধি
মাত্রা — তালিকার যেকোনো একটি ছত্রাকনাশক, প্রতি লিটার পানিতে উপরের মাত্রায় মিশিয়ে 10–15 দিন পর পর দুইবার স্প্রে করা যেতে পারে। ট্যাঙ্কের লিটার গুনে মাত্রা গুণ করুন — ঢাকনার আন্দাজে নয়। রোগ দেখা দিলে ইউরিয়ার উপরি প্রয়োগ বন্ধ, বদলে বিঘা প্রতি 5–7 কেজি এমওপি।
নিরাপদ ব্যবধান — ধান কাটার সম্ভাব্য তারিখ থেকে প্যাকেটে ছাপা PHI-এর দিনগুলো পিছিয়ে গুনুন — যে তারিখ পাবেন, সেটিই শেষ প্রয়োগের শেষ দিন। ব্রি’র এই বিজ্ঞপ্তিতে PHI ছাপা নেই, তাই সংখ্যাটি প্যাকেট থেকে বা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে নিন। অনুমান করবেন না।
সুরক্ষা সরঞ্জাম — এপ্রোন, গামবুট, মুখোশ, চশমা, হ্যান্ডগ্লাভস ও ক্যাপ; না পেলে গামছা, ফুলহাতা শার্ট আর পায়জামা। স্প্রে সকালে বা বিকেলে, বাতাসের বিপরীতে নয়। ছিটানোর পর জমিতে লাল নিশান পুঁতে দিন যাতে মানুষ ও গরু-ছাগল ঢুকে না পড়ে। খালি প্যাকেট মাটিতে পুঁতে ফেলুন; স্প্রে মেশিন পুকুর বা নালায় ধোবেন না। নিয়মগুলো কৃষি তথ্য সার্ভিসের নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবহার পাতা অনুসরণ করে।
সূত্র: ব্রি — ধানের ব্লাস্ট রোগের লক্ষণ ও তার প্রতিকার (মাত্রা) ও কৃষি তথ্য সার্ভিস, নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবহার — দেখা হয়েছে ১৫ আগস্ট ২০২৬ (সুরক্ষা)
জাত বাছাই আর সারের সিদ্ধান্ত — ব্লাস্টের বেশির ভাগ লড়াই এই দুটোতেই জেতা বা হারা হয়। ছত্রাকনাশক তার পরের কথা।
