আমন ক্ষেতে দূর থেকে তাকালে মনে হয় পাতাগুলো রোদে পুড়ে গেছে। কাছে গিয়ে একটা পাতা খুলে দেখলেই আসল কারণটা ধরা পড়ে — ভেতরে সবুজ রঙ চেঁছে খাওয়া, আর একটা কীড়া বসে আছে। এটি পাতা মোড়ানো পোকা। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের কীটতত্ত্ব বিভাগের রোপা আমন বিজ্ঞপ্তিতে এর ক্ষতি ও করণীয় দুটোই পরিষ্কার করে লেখা আছে, এবং সেখানে কীটনাশকের নাম আসে সবার শেষে।
পাতা মোড়ানো পোকা কীভাবে ক্ষতি করে
ডিম থেকে ফোটার পর কীড়াগুলো প্রথমে গাছের মাঝখানের দিকের পাতার একেবারে মাথায় দু-একদিন কুরে কুরে খায়। তারপর মুখের লালা দিয়ে পাতাটিকে লম্বালম্বিভাবে মুড়িয়ে নলাকার করে ফেলে, আর সেই মোড়ানো পাতার ভেতরে বসে পাতার সবুজ অংশ কুরে খেতে থাকে।
ক্ষতিটা এখানেই। সবুজ অংশ হারানো পাতা আর খাবার তৈরি করতে পারে না, তাই গাছ দুর্বল হয় এবং শীষে দানা ভরে কম। পাতা মুড়ে ফেলার পর ভেতরের কীড়ার গায়ে স্প্রে পৌঁছানো কঠিন — এই কারণেই দেরিতে স্প্রে করে ফল পাওয়া যায় না।
মাঠে কী দেখে চিনবেন
ব্রি’র বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত পাতায় প্রথমদিকে সাদা লম্বা খাওয়ার দাগ দেখা যায়। দাগগুলো পাতার শিরার সমান্তরালে লম্বা হয়, গোল বা ছড়ানো নয়। ক্ষতি খুব বেশি হলে পাতাগুলো পুড়ে যাওয়ার মতো দেখায়।
মিলিয়ে দেখুন
নলাকার মোড়ানো পাতা খুলে ভেতরে কীড়া বা তার বিষ্ঠা আছে কি না দেখুন। ভেতর খালি হলে পোকা চলে গেছে — তখন স্প্রে করে লাভ নেই, নতুন আক্রমণের জন্য নজর রাখুন। মাজরা পোকার মরা ডিগের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলবেন না: মাজরার ক্ষেত্রে মাঝের ডিগটাই শুকিয়ে যায়, পাতা মোড়ানো থাকে না।
কখন স্প্রে লাগবে: ব্রি’র ২৫% সীমা
এটাই সিদ্ধান্তের জায়গা। ব্রি লিখেছে, জমিতে শতকরা ২৫ ভাগ পাতা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তবেই অনুমোদিত কীটনাশকের একটি সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে। এর নিচে থাকলে নয়।
শতাংশটা চোখের আন্দাজে ধরবেন না। জমির কয়েক জায়গায় দাঁড়িয়ে ১০০টি করে পাতা দেখুন, তার মধ্যে কয়টিতে সাদা দাগ বা মোড়ানো অবস্থা আছে গুনুন। সীমাটি ব্রি’র রোপা আমন বিজ্ঞপ্তিতে দেওয়া। চারটি জায়গার গড়টাই আপনার হিসাব। কাজটা দশ মিনিটের।
স্প্রের আগে যে তিনটি কাজ
বিজ্ঞপ্তিতে কীটনাশকের তালিকার আগে তিনটি কাজ রাখা হয়েছে, এবং ক্রমটা ইচ্ছাকৃত।
- আলোক ফাঁদ ব্যবহার করুন। সন্ধ্যায় আলোয় মথ আকৃষ্ট হয়; ডিম পাড়ার আগে একটি স্ত্রী মথ মারা মানে একগাদা কীড়া ঠেকানো।
- জমিতে পার্চিং করুন। ডাল-পালা পুঁতে দিলে পোকা-খেকো পাখি বসে। খরচ শূন্য, আর একই ডাল মাজরা ও গাছফড়িং দুটোরই কাজে লাগে।
- ইউরিয়া সারের অতিরিক্ত ব্যবহার পরিহার করুন। বেশি ইউরিয়ায় পাতা নরম ও গাঢ় সবুজ হয়, যা এই পোকার জন্য সবচেয়ে পছন্দের খাবার।
তৃতীয়টি সবচেয়ে অবহেলিত। ইউরিয়া বাড়ালে ফলন বাড়বে ভেবে অনেকে উপরি প্রয়োগ করেন, আর তাতে পোকার আক্রমণ ডেকে আনেন। সারের মাত্রা বিঘা হিসাবে মিলিয়ে নেওয়ার ঘরে নিজের জমির হিসাবটা একবার দেখে নিন।
মাত্রা ছাড়ালে অনুমোদিত কীটনাশক ও মাত্রা
ব্রি’র তালিকা হেক্টর হিসাবে দেওয়া। পাশে বিঘার কলামটি ১ বিঘা = ৩৩ শতক ধরে হিসাব করা, যা সরকারি রেকর্ডের মাপ — আপনার এলাকার বিঘা আলাদা হলে সংখ্যাটাও বদলাবে।
| জেনেরিক নাম | ব্র্যান্ড নাম | মাত্রা / হেক্টর | মাত্রা / বিঘা |
|---|---|---|---|
| কার্বারিল | সেভিন ৮৫ এসপি | 1.7 কেজি | 227 গ্রাম |
| ক্লোরপাইরিফস | ডার্সবান ২০ ইসি | 1.0 লিটার | 134 মিলি |
| আইসোপ্রোকার্ব / এমআইপিসি | মিপসিন ৭৫ ডব্লিউপি | 1.12 কেজি | 150 গ্রাম |
ব্যবহারবিধি
মাত্রা — তালিকার যেকোনো একটি, একবারে — সেভিন ৮৫ এসপি 227 গ্রাম, ডার্সবান ২০ ইসি 134 মিলি, অথবা মিপসিন ৭৫ ডব্লিউপি 150 গ্রাম প্রতি বিঘায়। মেপে নিন, ঢাকনার আন্দাজে নয়। মিশ্রণে পরিষ্কার পানি।
নিরাপদ ব্যবধান — ধান কাটার সম্ভাব্য তারিখ থেকে প্যাকেটে ছাপা PHI-এর দিনগুলো পিছিয়ে গুনুন — যে তারিখ পাবেন, সেটিই শেষ প্রয়োগের শেষ দিন। ব্রি’র এই বিজ্ঞপ্তিতে PHI ছাপা নেই, তাই সংখ্যাটি প্যাকেট থেকে বা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে নিন। অনুমান করবেন না।
সুরক্ষা সরঞ্জাম — এপ্রোন, গামবুট, মুখোশ, চশমা, হ্যান্ডগ্লাভস ও ক্যাপ; না পেলে গামছা, ফুলহাতা শার্ট আর পায়জামা। স্প্রে সকালে বা বিকেলে, বাতাসের বিপরীতে নয়। ছিটানোর পর জমিতে লাল নিশান পুঁতে দিন যাতে মানুষ ও গরু-ছাগল ঢুকে না পড়ে। খালি প্যাকেট মাটিতে পুঁতে ফেলুন; স্প্রে মেশিন পুকুর বা নালায় ধোবেন না। নিয়মগুলো এসেছে কৃষি তথ্য সার্ভিসের নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবহার নির্দেশিকা থেকে।
সূত্র: ব্রি কীটতত্ত্ব বিভাগ, রোপা আমন বিজ্ঞপ্তি ১২.০৯.২০২১ (মাত্রা) ও কৃষি তথ্য সার্ভিস, নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবহার — দেখা হয়েছে ১৫ আগস্ট ২০২৬ (সুরক্ষা)
একই গ্রুপ প্রতি মৌসুমে না দিয়ে ঘুরিয়ে ব্যবহার করলে পোকা সয়ে যায় না। আর মনে রাখবেন, ধানে সাইপারমেথ্রিন বা ল্যাম্বডা-সাইহ্যালোথ্রিন গ্রুপের কীটনাশক ব্রি নিষেধ করেছে — কারণ ওগুলো উপকারী পোকা মেরে আক্রমণ উল্টো বাড়িয়ে দেয়। বাদামি গাছফড়িংয়ের লেখায় এই তালিকাটি বিস্তারিত আছে।
পাতা মুড়ে গেলে ভেতরের কীড়ায় স্প্রে পৌঁছায় না। তাই এই পোকার ক্ষেত্রে দেরি করে স্প্রে করার চেয়ে আগেভাগে আলোক ফাঁদ পাতা আর ইউরিয়া মেপে দেওয়াই বেশি কাজে দেয়।
